দেশব্যাপী ‘বাংলা কিউআর’ সম্প্রসারণে ব্র্যাক ব্যাংক রিটেইল, এসএমই ও করপোরেট এই তিন বিভাগকে যুক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এসএমই গ্রাহকের জন্য ‘বাংলা কিউআর’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা, ফার্মেসিগুলোকে কিউআর পেমেন্টে যুক্ত করা এবং গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘আস্থা’ অ্যাপকে আরও ‘বাংলা কিউআর’ বান্ধব করার কাজ চলছে। ক্যাশলেস অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনে সম্পৃক্ত করা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন মো. মাহীমুল ইসলাম, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও হেড অব রিটেইল ব্যাংকিং, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ‘বাংলা কিউআর’র বড় সুবিধাগুলো কী?
মো. মাহীমুল ইসলাম : ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট গ্রহণ করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। এর মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করলে জাল নোট কিংবা ছেঁড়াফাটা নোটের কারণে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না। অনেক সময় খুচরা টাকা না থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে ছাড় দিতে হয়। ‘বাংলা কিউআর’ এই সমস্যারও সমাধান করেছে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কাছে অতিরিক্ত নগদ অর্থ রাখা এবং তা বহনের ঝুঁকি কমে যাবে।
এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রথাগত ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। কারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রায় শতভাগ লেনদেন নগদে হওয়ায় ব্যাংকের পক্ষে তাদের প্রকৃত আয় ও ঝুঁকি নিরূপণ করা কঠিন হয়। ফলে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংকের সমস্যা হয়। ‘বাংলা কিউআর’র মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণ করলে ব্যাংকের কাছে ব্যবসায়ীদের একটি নির্ভরযোগ্য লেনদেনের রেকর্ড তৈরি হবে। সেই তথ্য পর্যালোচনা করে ব্যাংক সহজেই তাদের ঋণসহায়তা দিতে পারবে।
‘বাংলা কিউআর’র মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহককে ডিজিটাল লেনদেনে আরও সম্পৃক্ত করতে ব্র্যাক ব্যাংক কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে?
মো. মাহীমুল ইসলাম : ব্র্যাক ব্যাংক সবসময়ই সাধারণ গ্রাহককে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে কাজ করছে। ‘বাংলা কিউআর’র মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানোর অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী আন্তঃব্যবহারযোগ্য একটি অ্যাপ, যা ব্যবসায়ী ও গ্রাহককে সহজে এবং স্বল্প সময়ে লেনদেনের সুযোগ দেবে। এই লক্ষ্যেই ব্র্যাক ব্যাংক ‘আস্থা’ অ্যাপ চালু করেছে এবং নিয়মিত এর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ করছে। বর্তমানে ‘আস্থা’ অ্যাপ ব্যবহার করে প্রতি মাসে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই এই অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোড পেমেন্ট চালু ছিল। বর্তমানে আমরা অ্যাপটিকে আরও ‘বাংলা কিউআর’বান্ধব করার কাজ করছি।
ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এরই মধ্যে মার্চেন্টদের জন্য দেশের সবচেয়ে বড় ‘বাংলা কিউআর’ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ব্র্যাক ব্যাংকের নির্ধারিত ‘বাংলা কিউআর’ দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
‘বাংলা কিউআর’ সম্প্রসারণে আমরা রিটেইল, এসএমই ও করপোরেট এই তিন বিভাগকে যুক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। এরই মধ্যে নতুন এসএমই গ্রাহকদের ব্র্যাক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘বাংলা কিউআর’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আমরা যুক্ত হয়েছি। ফলে এসব কোম্পানি থেকে ওষুধ কেনা ফার্মেসিগুলোকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় সুবিধা ও প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
‘বাংলা কিউআর’র মূল উদ্দেশ্য কী? এর মাধ্যমে ক্যাশনির্ভরতা কতটা কমানো সম্ভব?
মো. মাহীমুল ইসলাম: ‘বাংলা কিউআর’ চালুর মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস, নিরাপদ এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। ২০২৭ সালের মধ্যে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করার যে লক্ষ্য রয়েছে, তার বড় একটি অংশ পূরণে ‘বাংলা কিউআর’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
মো. মাহীমুল ইসলাম : খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘বাংলা কিউআর’ জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো তাদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অভ্যস্ত করে তোলা। এখনো অনেক খুচরা ব্যবসায়ীর ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে প্রথমে তাদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে এবং ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে হবে। সাধারণত খুচরা ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয়। অনেকে এই খরচ এড়াতে এখনো নগদ লেনদেনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এ সমস্যা সমাধানে সরকারের প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে পেমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে গ্রাহকের করা পেমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায়ীদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের সুবিধাও চালু করেছি।
এ ছাড়া ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের ‘বাংলা কিউআর’ পেমেন্টের বিপরীতে রিওয়ার্ড পয়েন্ট দেওয়া হচ্ছে। এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে তারা কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা নিতে পারবেন। ব্র্যাক ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকের জন্যও ‘আস্থা’ অ্যাপ ব্যবহার করে ‘বাংলা কিউআর’ পেমেন্টের সুবিধা চালু করা হয়েছে। সারা দেশে আমাদের শাখা, উপশাখা, এসএমই ইউনিট অফিস ও এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে কর্মরত ১০ হাজারের বেশি সহকর্মী ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করছেন।
‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
মো. মাহীমুল ইসলাম: গ্রাহকদের এখন দোকানে গিয়ে কেনাকাটার পর নির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের কিউআর কোড খোঁজার প্রয়োজন নেই। ‘বাংলা কিউআর’ একটি সম্পূর্ণ সর্বজনীন ব্যবস্থা। ফলে ফোনে ব্র্যাক ব্যাংকসহ যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ থাকলেই একটি ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্ক্যান করে মুহূর্তেই পেমেন্ট করা সম্ভব। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কিউআর স্ক্যান করার পর পিন বা ওটিপি দেওয়ার আগে স্ক্রিনে প্রদর্শিত মার্চেন্টের নাম ও টাকার পরিমাণ অবশ্যই ভালোভাবে মিলিয়ে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিজের পিন বা পাসওয়ার্ড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে সুরক্ষিত থাকে। এটি যেমন গ্রাহকের মাসিক খরচের হিসাব রাখতে সাহায্য করবে, তেমনি নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনের নির্ভরযোগ্য রেকর্ড ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।