ক্যাশলেস বাংলাদেশের ভিত্তি হতে পারে বাংলা কিউআর

দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও আন্তঃসংযোগযোগ্য করতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী। ইতিমধ্যে পূবালী ব্যাংক দুই লাখ ৯০ হাজার বাংলা কিউআর মার্চেন্ট অনবোর্ড করেছে। আগামী এক বছরে এ সংখ্যা ছয় লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে ব্যাংকটির। বাংলা কিউআরের সম্ভাবনা, বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী।

দেশ রূপান্তর : আপনার দৃষ্টিতে বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে?

পূবালী ব্যাংক : বাংলা কিউআর বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ‘এক দেশ, এক কিউআর’ ধারণা। একটি কিউআর ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবাদাতার গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থগ্রহণ করা সম্ভব। এতে ব্যবসায়ীদের পরিচালনাগত জটিলতা কমবে, গ্রাহকদের পেমেন্ট আরও সহজ হবে এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আসবেন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার হবে।

দেশ রূপান্তর : বাংলা কিউআর চালুর ফলে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা কী সুবিধা পাবেন?

পূবালী ব্যাংক : গ্রাহকরা নগদ অর্থ বা কার্ড বহন না করেই নিজেদের পছন্দের ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে দ্রুত ও নিরাপদে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ বহন, চুরি-ছিনতাই, জাল বা ছেঁড়া নোটের ঝুঁকি কমবে। লেনদেনের অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ায় নগদ অর্থ ব্যাংকে জমা দেওয়ার ঝামেলাও কমবে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড থাকায় হিসাব-নিকাশ স্বচ্ছ ও সহজ হবে। ভবিষ্যতে এসব তথ্য ব্যবসায়ীদের ঋণপ্রাপ্তিতেও সহায়ক হতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আপনার প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের অগ্রগতি কেমন?

পূবালী ব্যাংক : ২০২৩ সাল থেকেই পূবালী ব্যাংক এ উদ্যোগের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ইতিমধ্যে সারা দেশে দুই লাখ ৯০ হাজার বাংলা কিউআর মার্চেন্ট অনবোর্ড করা হয়েছে। আমাদের মার্চেন্টরা তাৎক্ষণিক ফান্ড সেটেলমেন্ট সুবিধা পান। সারা দেশের ৮০০ শাখা ও উপশাখার মাধ্যমে মার্চেন্ট অনবোর্ডিং চলছে। এ ছাড়া মার্কেট, শপিংমল, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় ৫০০-এর বেশি ক্যাশলেস ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। চলতি বছরে এক হাজার ২০০টির বেশি ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিটি শাখা ও উপশাখায় ‘বাংলা কিউআর ব্র্যান্ডিং অফিসার’ দায়িত্ব পালন করছেন।

দেশ রূপান্তর : আগামী এক বছরে বাংলা কিউআর বিস্তারে কী পরিকল্পনা রয়েছে?

পূবালী ব্যাংক : আগামী এক বছরে মার্চেন্ট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও বাজারে বাংলা কিউআরের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যাশব্যাক, রিওয়ার্ড, বিশেষ অফার ও যৌথ প্রচারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি বাংলা কিউআর মার্চেন্টদের ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাসের ভিত্তিতে ন্যানো ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে এটি কতটা জনপ্রিয় করা সম্ভব?

পূবালী ব্যাংক : বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এর জন্য ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি বা অবকাঠামোর প্রয়োজন নেই। তবে ব্যাপক প্রসারের জন্য সচেতনতা, সহজ অনবোর্ডিং, স্থানীয় প্রচার ও প্রাথমিক পর্যায়ে প্রণোদনা প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে এর আওতায় আনা সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলা কিউআর কতটা কার্যকর?

পূবালী ব্যাংক : বাংলা কিউআর নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল পেমেন্টভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। এর মাধ্যমে অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। ফলে নগদ অর্থ বহন, চুরি-ছিনতাই ও জাল নোটের ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হওয়ায় অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বাড়ে।

দেশ রূপান্তর : ইন্টারঅপারেবিলিটি বৃদ্ধিতে বাংলা কিউআরের ভূমিকা কী?

পূবালী ব্যাংক : এটাই বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি কিউআর দিয়েই অংশগ্রহণকারী ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবাদাতার গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া যায়। এতে একটি শক্তিশালী ও একীভূত জাতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে উঠছে।

দেশ রূপান্তর : গ্রাহকদের মধ্যে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

পূবালী ব্যাংক : ডিজিটাল সচেতনতার অভাব, প্রযুক্তির প্রতি আস্থার ঘাটতি, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় এবং নগদ লেনদেনের দীর্ঘদিনের অভ্যাস বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাপক প্রচার ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব বাধা দূর করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : নিরাপত্তা ও প্রতার রোধে কী ব্যবস্থা প্রয়োজন?

পূবালী ব্যাংক : বাংলা কিউআর নিরাপদ প্রযুক্তিগত মানদন্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। তবে ব্যবহারকারীর সচেতনতাও জরুরি। গ্রাহকদের পেমেন্টের আগে মার্চেন্টের নাম ও টাকার পরিমাণ যাচাই করতে হবে। ব্যবসায়ীদেরও পেমেন্ট সফল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পণ্য বা সেবা দেওয়া উচিত।