ভুয়া কিউআর কোড ও প্রতারণার বিষয়ে সচেতন হতে হবে

দেশে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলা কিউআরকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। তার মতে, একটি অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলামকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলা কিউআরের সম্ভাবনা, বাস্তবায়ন অগ্রগতি, মার্চেন্ট সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা এবং আগামী এক বছরে প্রায় এক লাখ মার্চেন্ট অনবোর্ডিংয়ের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।

বাংলা কিউআর কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে একটি অভিন্ন কিউআর স্ট্যান্ডার্ডেও প্রচলন হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সেবাদাতার মধ্যে সহজে লেনদেন করা যাবে। ফলে গ্রাহকদের আলাদা আলাদা কিউআর ব্যবহার করতে হবে না। ব্যবসায়ীদেরও একাধিক কিউআর প্রদর্শনের প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ এটি একটি ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে।

বাংলা কিউআর ব্যবহারে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা কী সুবিধা পাবেন?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : বাংলা কিউআরের বড় সুবিধা হলো, একটি কিউআর ব্যবহার করেই বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপ থেকে পেমেন্ট করা যাবে। ফলে গ্রাহককে আলাদা আলাদা কিউআর খুঁজতে হবে না। কিউআর স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিরাপদে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। এতে নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমবে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, পণ্য ও সেবার দামের সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা যাবে। অনেক সময় খুচরা টাকা না থাকায় গ্রাহককে এক-দুই বা কয়েক টাকা বেশি দিতে হয়। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে সেই সমস্যা থাকবে না।

ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও সুবিধা অনেক। একাধিক ব্যাংক বা এমএফএসের আলাদা কিউআর প্রদর্শনের প্রয়োজন হবে না। এতে পরিচালনা সহজ হবে এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহকদের কাছ থেকে পেমেন্ট গ্রহণ করা সম্ভব হবে। নগদ অর্থ গণনা, সংরক্ষণ ও ব্যাংকে জমা দেওয়ার ঝুঁকি ও ব্যয় কমবে। জাল বা ছেঁড়াফাটা নোটের ঝামেলাও থাকবে না। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হওয়ায় হিসাবরক্ষণ ও অডিট সহজ হবে।

নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বাংলা কিউআর কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বাংলা কিউআর অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ নগদ অর্থ বহন ও লেনদেনের প্রয়োজন বেশ কমে আসবে। দোকান, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, হাসপাতালসহ ক্ষুদ্র ও বড় ব্যবসায় ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ বাড়লে লেনদেন আরও দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ হবে। একই সে ঙ্গ নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার খরচ ও ঝুঁকিও কমবে।

গ্রাহকদের জন্য বাংলা কিউআর ব্যবহারে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সচেতনতা ও অভ্যাসগত পরিবর্তন। বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ দৈনন্দিন লেনদেনে নগদ অর্থ ব্যবহারে অভ্যস্ত। তাই ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা সম্পর্কে আস্থা ও সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া কিছু এলাকায় স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এবং সাইবার নিরাপত্তার বিষয়গুলোও চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পর্যাপ্তসংখ্যক ব্যবসায়ী বাংলা কিউআর গ্রহণ না করলে গ্রাহকদের আগ্রহও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়বে না। এ জন্য ব্যাংক, এমএফএস, পেমেন্ট সেবাদাতা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সচেতনতামূলক প্রচারণা, সহজ ব্যবহার, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, দ্রুত গ্রাহক সহায়তা এবং ক্যাশব্যাক বা ডিসকাউন্টের মতো প্রণোদনা গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলা কিউআর কতটা নির্ভরযোগ্য?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : বাংলা কিউআর আন্তর্জাতিক ইএমভিকো স্ট্যান্ডার্ডভিত্তিক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি নিরাপদ ও ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট ব্যবস্থা। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এটি নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। তবে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে সামাজিক প্রকৌশল বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্যবহারকারীর অসচেতনতা বড় ঝুঁকি। ভুয়া কিউআর কোড, ফিশিং, প্রতারণামূলক ফোনকল বা লিংকের মাধ্যমে গ্রাহক প্রতারণার শিকার হতে পারেন। এ জন্য গ্রাহকদের নিয়মিত সচেতন করতে হবে।

সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ কতটা রয়েছে?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : সরকারিসেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এসব খাতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ছোট ও মাঝারি অঙ্কের লেনদেন হয়। একটি কিউআর ব্যবহার করে সহজে পেমেন্ট করা সম্ভব হওয়ায় এসব খাতে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

আপনার প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের বর্তমান অগ্রগতি কী?

কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম : আমাদের প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও পরীক্ষামূলক (ইউএটি) কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের গ্রাহকরা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘রূপালীক্যাশ’ এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ‘রূপালী ই-ব্যাংক’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাংলা কিউআর দিয়ে পেমেন্ট করতে পারছেন। একইভাবে মার্চেন্টরাও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারছেন। আমাদের লক্ষ্য হলো খুব শিগগির দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধাপে ধাপে বাংলা কিউআর সেবা সম্প্রসারণ করা এবং অধিকসংখ্যক গ্রাহক ও ব্যবসায়ীকে এই একীভূত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। আগামী এক বছরের মধ্যে প্রায় এক লাখ মার্চেন্ট অনবোর্ডিং করা সম্ভব হবে। গ্রাহকসেবা, মার্চেন্ট অনবোর্ডিং এবং সংশ্লিষ্ট জনবলকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ অন্য কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।