বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বললেন

ভবিষ্যৎ ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর ভিত্তি

নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাশলেস অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও সর্বজনীন করা। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘বাংলা কিউআর’কে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

গভর্নরের পরিকল্পনায় ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারসহ (পিএসপি)বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাকে একটি আন্তঃপরিচালনযোগ্য কাঠামোর আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শহর থেকে গ্রাম, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষুদ্র দোকান সব পর্যায়ের মানুষকে ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় এনে ধীরে ধীরে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলা কিউআরকে শুধু একটি পেমেন্ট পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একটি নির্দিষ্ট কিউআর কোড ব্যবহার করে যাতে বিভিন্ন ব্যাংক, এমএফএস ও পিএসপির গ্রাহক সহজেই অর্থ পরিশোধ করতে পারেন, সেই আন্তঃসংযোগযোগ্য ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআর ব্যবস্থা রয়েছে। এতে একজন ব্যবসায়ীকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কিউআর কোড রাখতে হয় এবং গ্রাহককেও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিউআর অনুযায়ী পেমেন্ট করতে হয়। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে এই বিভাজন কমিয়ে একটি সমন্বিত পেমেন্ট পরিবেশ গড়ে তোলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য। এর ফলে একটি কিউআর কোডের মাধ্যমেই বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

গভর্নরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলা কিউআর ব্যবস্থার বিস্তার ঘটানো গেলে ডিজিটাল লেনদেন সাধারণ মানুষের জন্য আরও সহজ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে। একজন গ্রাহক নিজের ব্যাংক বা আর্থিক সেবার অ্যাপ ব্যবহার করে দোকানে থাকা বাংলা কিউআর স্ক্যান করেই অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এতে নগদ অর্থ বা কার্ড বহনের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে  ভাঙতি টাকার ঝামেলা, জাল নোট এবং নগদ অর্থকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঝুঁকিও কমে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, এটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে। বিশেষ করে ছোট দোকান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীরা কম খরচে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন। তাদের ডিজিটাল লেনদেনের একটি আনুষ্ঠানিক আর্থিক রেকর্ড তৈরি হবে। ভবিষ্যতে এই লেনদেনের ইতিহাস বা আর্থিক ফুটপ্রিন্ট ব্যবহার করে ঋণ ও অন্যান্য অর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে।

গভর্নরের পরিকল্পনায় ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তারের সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে বাংলা কিউআর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের একটি স্বচ্ছ ও অনুসরণযোগ্য রেকর্ড তৈরি হওয়ায় লেনদেনে জবাবদিহি বাড়বে এবং অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আরও শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা ইতিমধ্যে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন), রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস), মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস), আন্তঃব্যাংক ফান্ড ট্রান্সফার (আইবিএফটি), পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) ও ই-কমার্সের পাশাপাশি বাংলা কিউআরও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। এসব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৃহত্তর পরিকল্পনা।

তবে বাংলা কিউআরকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় ও কার্যকর করতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর), সর্বত্র আন্তঃপরিচালনযোগ্য পেমেন্ট সুবিধা নিশ্চিত করা, স্মার্টফোন ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের সীমিত প্রাপ্যতা, ডিজিটাল ও আর্থিক সাক্ষরতার ঘাটতি এবং তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ কারণে বাংলা কিউআর সম্প্রসারণের পাশাপাশি গ্রাহক ও মার্চেন্টদের সচেতনতা বাড়ানো, ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা তৈরি এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং গ্রাহকদের মধ্যে এর সুবিধা সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালানো হলে এই উদ্যোগের সুফল আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য, এমন একটি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে, লেনদেন হবে সহজ, দ্রুত, স্বচ্ছ ও অনুসরণযোগ্য এবং দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। আর এই রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’কে সামনে রেখে এগোতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে একটি কিউআর কোডের মাধ্যমেই দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার যেমন বাড়বে, তেমনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য লেনদেন আরও সহজ ও নিরাপদ হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর মাধ্যমে নগদনির্ভরতা কমিয়ে একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার পথ আরও শক্তিশালী হবে।