ইয়ামাল রূপকথা

রোক্কাফন্দার চরম দারিদ্র্য থেকে বিশ্বমঞ্চে স্পেনের রাজকীয় মুকুট মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ফুটবলের বৃত্ত পূরণ করেছেন লামিন ইয়ামাল। শেকড় না ভোলা এই বিশ্বজয়ী রূপকথার নায়কের অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প লিখেছেন জারা মাহাজাবীন

ফুটবল বিশ্ব যুগে যুগে অনেক বিস্ময়বালকের জন্ম দেখেছে, কিন্তু মাত্র ১৯ বছর বয়সের মধ্যে ফুটবল নামক খেলাটিকে পুরোপুরি ‘বৃত্ত পূরণ’ করে ফেলার নজির ইতিহাসে বিরল। তিনি লামিন ইয়ামাল নাসরাউই ইবানা। যার বাঁ পায়ের জাদুতে কখনো চূর্ণ হয় প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ, আবার যার হাসিতে লুকিয়ে থাকে স্পেনের এক প্রান্তিক উপশহরের দারিদ্র্য জয়ের গল্প। ২০২৪ সালের ইউরো জয় থেকে শুরু করে ২০২৬ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে বিশ্বজয়ের মহাকাব্য সবখানেই এই কিশোরের নাম খোদাই করা। তবে এই রাজকীয় মুকুটের পেছনে রয়েছে এক উদ্বাস্তু পরিবারের অসীম ত্যাগ, ভাঙা সংসার এবং এক পরম ভ্রাতৃত্বের গল্প।

জন্ম, মা-বাবা ও রোক্কাফন্দার ‘৩০৪’

২০০৭ সালের ১৩ জুলাই বার্সেলোনার এসপ্লুগুয়েস দে ইয়োব্রেগাত এলাকায় জন্ম নেন লামিন ইয়ামাল। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কো থেকে আসা এক অভিবাসী এবং মা শিলা ইবানা এসেছেন সেন্ট্রাল আফ্রিকার দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে। লামিনের নামের পেছনে রয়েছে এক চমৎকার কৃতজ্ঞতার ইতিহাস। তার জন্মের আগে যখন মা-বাবা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে বাড়িভাড়া দিতে পারছিলেন না, তখন ‘লামিন’ ও ‘ইয়ামাল’ নামের দুই প্রতিবেশী তাদের নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। সেই ঋণ শোধ করতেই মা-বাবা ছেলের নাম রাখেন ‘লামিন ইয়ামাল’।

লামিনের বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর লামিনের বেড়ে ওঠা কাটে কাতালুনিয়ার মাতারো শহরের অবহেলিত ও দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণির এলাকা ‘রোক্কাফন্দা’তে। মা শিলা ফাস্টফুড দোকানে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ছেলেকে বড় করেছেন আর বাবা মুনির লোহালক্কড় বা ভাঙারি কুড়ানোর কাজ করেও ছেলের ফুটবলের স্বপ্নকে মরতে দেননি। এই চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও দাদি ফাতিমা ছিলেন লামিনের ছায়াসঙ্গী, যিনি মরক্কো থেকে এসে এই পরিবারটিকে আগলে রেখেছিলেন এবং প্রতিদিন লামিনকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। আজও প্রতিটি গোলের পর দুই হাতের আঙুল দিয়ে লামিন যে ‘৩০৪’ উদযাপন করেন, তা আসলে রোক্কাফন্দা এলাকার পোস্টাল কোডের শেষ তিন ডিজিট। নিজের শেকড়কে কখনোই ভুলে যাননি এই তরুণ তুর্কি।

বার্সেলোনা ও ১ বিলিয়নের চুক্তি

মাত্র ছয় বছর বয়সে মাতারোর রাস্তায় ধুলোবালি মেখে ফুটবল খেলার সময় বার্সেলোনার স্কাউটদের চোখে পড়েন লামিন। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় বার্সার বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে। লা মাসিয়াই ছিল লামিনের আসল রূপান্তরের জায়গা। বলের ওপর তার অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিংয়ের চাতুর্য আর নিখুঁত পাসিং সেন্স দেখে কোচরা বুঝতে পেরেছিলেন এই ছেলে সাধারণ কেউ নয়।

২০২৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক ঘটিয়ে ক্লাবের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হওয়ার রেকর্ড গড়েন তিনি। লিওনেল মেসির পর বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘১০ নম্বর’ জার্সির ব্যাটন যেন তারই কাঁধে এসে বর্তায়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে বার্সাকে ঘরোয়া ট্রেবল জেতাতে (লা লিগা, কোপা দেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ) তিনি বড় ভূমিকা রাখেন।

তার এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের কারণে ইউরোপের অন্য সব ক্লাবের চোখ রাঙানি এড়াতে ২০২৫ সালের মে মাসে বার্সেলোনা তার সঙ্গে ২০৩১ সাল পর্যন্ত একটি বিশাল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নবায়ন করে। বার্সেলোনা এই চুক্তিতে তার রিলিজ ক্লজ বা বাই-আউট ক্লজ নির্ধারণ করেছে ১.১ বিলিয়ন ইউরো (১১০ কোটি ইউরো), যা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ এবং যা তাকে বিশে^র সবচেয়ে দামি ও সুরক্ষিত তরুণ ফুটবলারে পরিণত করেছে। বর্তমানে বার্সেলোনা থেকে তিনি বার্ষিক প্রায় ১৮ থেকে ২১.৫ মিলিয়ন ডলার মূল বেতন পান।

ব্যালন ডি অর

লামিন ইয়ামাল কেবল ম্যাচই জেতাননি, ব্যক্তিগত অর্জনেও ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছেন। ২০২৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি অর-এর জন্য মনোনীত হন। এরপর ২০২৫ সালের ব্যালন ডি অর অনুষ্ঠানে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ব্যালন ডি অরের চূড়ান্ত তালিকায় রানার্স-আপ (দ্বিতীয় স্থান) অর্জন করেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে স্পেনকে বিশ^কাপ জেতানোর পর ফুটবল পণ্ডিতদের মতে, ২০২৬ সালের ব্যালন ডি অর জয়ের সবচেয়ে বড় ফেভারিট এখন তিনিই।

পাশাপাশি, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে টানা দুবার ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সেরা অনূর্ধ্ব-২১ খেলোয়াড় হিসেবে  ‘কোপা ট্রফি’তে ভূষিত করে। কোপা ট্রফির ইতিহাসে লামিন ইয়ামালই প্রথম এবং একমাত্র ফুটবলার যিনি টানা দুবার এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি নিজের করে নিয়েছেন।

স্পেনের জার্সিতে বিশ্বজয়

ইয়ামাল চাইলে বাবার দেশ মরক্কো কিংবা মায়ের দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনির হয়েও খেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নেন নিজের জন্মভূমি স্পেনকে। আর স্পেনের লা রোহাদের জার্সিতে তিনি যা করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ২০২৪ সালের ইউরো কাপে পুরো টুর্নামেন্ট মাতিয়ে স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন করেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন।

কিন্তু ইয়ামাল গল্পের শেষ এখানেই ছিল না। ২০২৬ ফিফা বিশ^কাপে লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের হয়ে তিনি বিশ^মঞ্চে নামেন। নকআউট পর্বে অসাধারণ খেলে ফাইনালে মুখোমুখি হন ফুটবল ঈশ্বর লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে বিশ^ চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইউরো এবং বিশ্বকাপ দুই বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতে ফুটবলকে যেন এক প্রকার ‘কমপ্লিট’ করে ফেলেন লামিন ইয়ামাল। ম্যাচের শেষে ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি মেসি যখন ১৯ বছরের ইয়ামালকে বুকে জড়িয়ে ধরেন, তখন বিশ্ববাসী ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ‘ব্যাটন বদল’-এর সাক্ষী হয়। ২০০৭ সালে ইউনিসেফের এক চ্যারিটি ফটোশুটে ২০ বছর বয়সী মেসি যেভাবে শিশু ইয়ামালকে গোসল করিয়েছিলেন, সেই গল্প যেন ২০২৬-এর ফাইনালে এসে এক পূর্ণতা পায়।

ব্যক্তিগত জীবন

লামিন ইয়ামালের এই চোখ ধাঁধানো ফুটবল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবনও এখন প্রচারের আলোয়। ইউরো ২০২৪-এর সময় তার সঙ্গে মডেল অ্যালেক্স প্যাডিলার সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হলেও পরে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ২০২৫ সালের শেষ দিকে আর্জেন্টাইন র‌্যাপার নিকি নিকোলের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত একটি সম্পর্কের পর, ২০২৬ সালের শুরুতে লামিনের জীবনে আসেন স্প্যানিশ ফ্যাশন এবং লাইফস্টাইল ইনফ্লুয়েন্সার ইনেস গার্সিয়া সান্তোস।

২১ বছর বয়সী সেভিয়ার মেয়ে ইনেস গার্সিয়ার সঙ্গে ২০২৬ সালের এপ্রিলে গ্রিস ভ্রমণের মাধ্যমে লামিন নিজের সম্পর্ক প্রকাশ্য আনেন। মে মাসে বার্সেলোনার অফিশিয়াল টিম ডিনারেও ইনেস তার পাশে ছিলেন। ইনেস জানিয়েছেন, কোনো শপিংমল বা এয়ারপোর্টের নাটকীয়তায় নয়, তাদের পরিচয় হয়েছিল খুব সাধারণ উপায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে গ্যালারিতে বসে স্পেনের জার্সি গায়ে ইনেসকে লামিনের জন্য গলা ফাটাতে দেখা গেছে। ফাইনাল জয়ের পর মাঠের ভেতরে ট্রফি হাতে এই যুগলের উদযাপনের ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে।

ছোট ভাই কাইনে

মাঠের বাইরে তার ছোট ভাই কাইনের সঙ্গে সম্পর্কটা সবচেয়ে মধুর। কাইনে হলো লামিনের ছোট সৎ ভাই, যার জন্ম ২০২২ সালে। কিন্তু সৎ ভাই হলেও লামিনের কাছে কাইনে নিজের সন্তানের মতো। লামিন নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার ছোট ভাই আমার কাছে সবকিছু। আমি ওর প্রেমে অন্ধ।’

২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালীন গ্যালারিতে বসে কেইনের ‘ভামোস!’ (এগিয়ে যাও) বলে চিৎকার করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফাইনাল ম্যাচ জেতার পর লামিন ইয়ামাল সব উদযাপন ছেড়ে গ্যালারির দিকে ছুটে যান এবং ছোট ভাই কাইনেকে কোলে তুলে নিয়ে মাঠে আসেন। মেডেল গলায় ঝুলিয়ে বড় ভাইয়ের ট্রফি নিয়ে কেইনের দুষ্টুমির দৃশ্যটি ছিল অসাধারণ। লামিন সবসময় চান, তিনি শৈশবে যে দারিদ্র্য দেখেছেন, তার ছোট ভাই যেন তা থেকে দূরে থেকে একটি সুন্দর ও রাজকীয় শৈশব উপভোগ করতে পারে।

চাপের মুখে অবিচল একনায়ক

আজকের ফুটবল বিশ্বে যেখানে কোটি টাকার চাপ ভক্তের প্রত্যাশা অনেক বড় খেলোয়াড়কে পিষে ফেলে, সেখানে ১৯ বছরের লামিন ইয়ামাল খেলেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের আগে চাপের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘ফুটবল খেলতে গিয়ে আমি কখনো চাপ অনুভব করি না। আমার মা যখন ১৬ বছর বয়সে আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন, সেটা ছিল আসল চাপ। আমার বাবা যখন আমাদের খাওয়া জোগাতে রাস্তায় লোহা কুড়াতেন, সেটা ছিল আসল চাপ। আমি তো কেবল ফুটবল খেলি!’

এই দর্শনই লামিন ইয়ামালকে অনন্য করে তুলেছে। তিনি শুধু একজন বিশ^জয়ী ফুটবলার নন; তিনি স্পেনের অভিবাসী সমাজের প্রতিনিধি, রোক্কাফন্দার অন্ধকার গলি থেকে উঠে আসা এক আলোকবর্তিকা এবং এক স্নেহময় বড় ভাই।