ওকে প্রথম কবে দেখেছি মনে নেই। তবে ওর বেশ ভালো ভালো ছবি তুলেছিলাম শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলে। এটি ১৭ জানুয়ারি ২০১৪-এর ঘটনা। বিরল ও দুর্লভ জলচর পাখির খোঁজে বাইক্কা বিলে এসেছি সকাল সাড়ে ৮টায়। কিন্তু পুরো এলাকা তখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কুয়াশার মধ্যেই পাখি খোঁজা শুরু করলাম। আট-দশ প্রজাতির হাঁস, সাত-আট প্রজাতির বক, ঈগল, পানকৌড়ি, জলপিপি, কালেম, ডুংকর ও অন্য জলার পাখি পেলাম। কিন্তু ছবি ভালো হলো না।
কুয়াশা কেটে আলো ফুটতে ফুটতে দুপুর ১টা। মিরাস মাঝির নৌকায় চেপে বিলের হাঁসগুলোর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলাম। প্রচুর ছবি তুললাম। হোটেলে ফিরে রাতে ছবি রিভিউ করার সময় একটি ছবির ঝাপসা হয়ে যাওয়া অংশের ওপর চোখ আটকে গেল। ‘পেয়েছি, পেয়েছি, যাকে খুঁজছিলাম এত দিন ধরে’ (বলে চেঁচিয়ে উঠলাম। ছবির ঝাপসা হয়ে যাওয়া পাখিটাকে বাস্তবে দেখার জন্য আর তর সইছিল না। কোনো রকমে রাতটা পার করলাম।
পরদিন সকালে আবারও বাইক্কা বিলে গেলাম। টাওয়ার থেকে টেলিস্কোপে পাখিটার অবস্থান দেখে নিলাম। এরপর মিরাস মাঝির নৌকায় চেপে পাখিটার কাছাকাছি গেলাম। সে চমৎকার ভঙ্গিতে পানিতে পোতা একটি বাঁশের খুঁটিতে ডানা মেলে বসেছিল। আশপাশে আরও দু-তিনটি পাখির দেখা পেলাম। পরে পাখিটিকে বহুবার দেখেছি রাজশাহীর পদ্মা নদীতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দায়, চরইল বিলে, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া হাওরে আর ফেনীর মুহুরী বাঁধ প্রকল্পে। সর্বশেষ এ বছরের ২৫ জানুয়ারি দুপুরে বাইক্কা বিল থেকে ফেরার পথে একটি বড় পুকুরে পাখিটির দেখা পেলাম।
এতক্ষণ যে পাখিটির কথা বললাম সে এ দেশের এক দুর্লভ ও প্রায় শঙ্কাগ্রস্ত আবাসিক পাখি। সাপপাখি বা সাপগলা তার নাম। সাঁতার কাটার সময় লম্বা গলা ও মাথা পানির ওপর এমনভাবে রাখে দেখতে যা সাপের মতো লাগে, তাই এই নাম। অবশ্য গয়ার বা রাগা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ঙৎরবহঃধষ উধৎঃবৎ, উধৎঃবৎ বা ঝহধশবনরৎফ। আনহিঙ্গিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম অহযরহমধ সবষধহড়মধংঃবৎ। বাংলাদেশ ছাড়াও আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মিলে।
এটি বেশ বড় আকারের পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ৮৫-৯৭ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ১১০-১৩০ সেন্টিমিটার ও ওজন ১.০-১. ৮ কেজি। পুরো দেহের পালক একনজরে কালো। মাথা, ঘাড় ও কাঁধ-ঢাকনির ওপরের অংশ বাদামি। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একই রকম। প্রজননকালে পুরুষের পিঠ কালো, গলা সাদা এবং ঘাড় ও মাথা মখমল চকলেট-বাদামি দেখায়। ডানা ও দেহের পেছনে রূপালি-ধূসর লম্বালম্বি দাগ থাকে। দেহের নিচটা চকচকে কালো। হলদে বলয়সহ চোখ সাদা। চঞ্চু দু-রঙা, ওপরেরটা কালচে-বাদামি ও নিচেরটা হলুদ। পা কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ কালচে-বাদামি, ঘাড়ে লম্বালম্বি রূপালি-ধূসর দাগ থাকে এবং দেহের নিচের অংশ ও লেজ বাদামি।
এ দেশের বড় বড় হাওর, বিল, নদী ও হ্রদে এদের দেখা মেলে। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। ডুব দিয়ে ছোরার মতো চঞ্চুর মাধ্যমে মাছ শিকার করে খায়। পানিতে পোতা কোনো বাঁশে, গাছের শাখায় বা মাটিতে সুন্দর ভঙ্গিমায় ডানা মেলে বসে থাকে। প্রজননকালে একটি শব্দে ‘চিগি-চিগি-চিগি ---’ স্বরে বারবার ডাকে।
মে থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় পানির কাছে বড় কোনো গাছের শাখায় শুকনো সরু ডালপালা দিয়ে ঢিলেঢালা বাসা বানায়। সচরাচর ছোট কলোনি করে বাসা তৈরি করে। প্রতিটি গাছে চার থেকে পাঁচটি বাসা থাকে। অনেক সময় বকের বাসার সঙ্গেও বাসা তৈরি করতে পারে। ডিম পাড়ে তিন থেকে ছয়টি, রঙ ফ্যাকাশে সবুজাভ-নীল। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোঁটে ২৪-২৬ দিনে। ছানারা প্রায় ৫০ দিন বয়সে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। প্রজননক্ষম হতে প্রায় দু-বছর লাগে। আয়ুষ্কাল প্রায় নয় বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ