দুই অঙ্গের হেফাজতে জান্নাতের নিশ্চয়তা

জান্নাত লাভের আকাক্সক্ষা সবারই থাকে। এটা মানুষের খুবই স্বাভাবিক চাহিদা। তবে জান্নাত লাভের জন্য সবাই সচেতন নয়। মানুষের এমন কিছু অঙ্গ রয়েছে, যেগুলোর সঠিক ব্যবহার তাকে জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়, আবার অপব্যবহার তাকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো জিহ্বা ও লজ্জাস্থান। মানুষের অধিকাংশ গুনাহ এই দুই অঙ্গের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুটি অঙ্গের হেফাজতকে জান্নাত লাভের অন্যতম বড় মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং তার দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ (লজ্জাস্থান)-এর হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিসে দুটি অঙ্গের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হলেও এর তাৎপর্য অনেক বিস্তৃত। কারণ মানুষের অসংখ্য গুনাহের সূচনা হয় জিহ্বা থেকে, আর চরিত্রের বড় বিপর্যয়গুলো ঘটে লজ্জাস্থানের অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে। তাই যে ব্যক্তি এই দুটি অঙ্গকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

জিহ্বা মানুষের জন্য যেমন আল্লাহর বড় নেয়ামত, তেমনি এটি বড় পরীক্ষাও। একটি কথা মানুষের মর্যাদা বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার একটি কথাই তাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বানিয়ে দিতে পারে। মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, চোগলখোরি, মিথ্যা সাক্ষ্য, গালি, অশ্লীল ভাষা কিংবা মানুষের মনে কষ্ট দেয় এমন কথাবার্তা সবই জিহ্বার গুনাহ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন তৎপর প্রহরী তা লিপিবদ্ধ করার জন্য উপস্থিত থাকে।’ (সুরা কাফ ১৮) তাই একজন মুমিনের উচিত, কথা বলার আগে চিন্তা করা, প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা এবং সর্বদা সত্য ও কল্যাণকর কথা বলা।

একইভাবে লজ্জাস্থানের হেফাজত ইসলামের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।’ (সুরা নুর ৩০) তাই ব্যভিচার, অবৈধ সম্পর্ক, অশ্লীলতা এবং সব ধরনের যৌন অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।

বর্তমান সময়ে উল্লিখিত হাদিসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধ মন্তব্য, অপবাদ, বিদ্রুপ, গিবত, মিথ্যা প্রচার এবং চরিত্রহনন যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একইভাবে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে অশ্লীলতা ও অবৈধ সম্পর্কের পথও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। ফলে একজন মুসলমানকে শুধু বাস্তব জীবনেই নয়, ভার্চুয়াল জীবনেও নিজের জিহ্বা, দৃষ্টি ও চরিত্রের হেফাজত করতে হবে।

এই দুটি অঙ্গের হেফাজতের জন্য কিছু বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কথা বলার আগে ভেবে নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়িয়ে চলা, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে জিহ্বাকে ব্যস্ত রাখা, দৃষ্টি সংযত রাখা, সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা এবং গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। যাদের বিয়ের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের জন্য দ্রুত বিয়ে করাও চরিত্র সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

প্রকৃত সফলতা নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই নিহিত। যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বাকে মিথ্যা, গিবত ও অশ্লীলতা থেকে এবং নিজের লজ্জাস্থানকে সব ধরনের হারাম কাজ থেকে রক্ষা করতে পারে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হয়। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত, প্রতিদিন নিজের কথা ও আচরণের হিসাব নেওয়া এবং এই দুটি অঙ্গের হেফাজত করা। এগুলোর সঠিক হেফাজত ব্যক্তিজীবনকে পবিত্র করে এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নৈতিকতা ও শান্তির ভিত্তি সুদৃঢ় করে।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক