দাম্পত্যে সদাচরণ

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এ বিষয়ে এমন সব বিধান প্রণয়ন করেছে, যা পরিবারের কল্যাণ সংরক্ষণ করে এবং তা থেকে অনিষ্ট, বিপর্যয় ও অকল্যাণের কারণগুলো দূর করে। এই বিধানগুলোর অন্তর্ভুক্ত কিছু বিষয় দাম্পত্য জীবনে এমন পরিস্থিতির সমাধান দেয়, যখন বৈবাহিক জীবনের কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য ও বৈধ স্বার্থ নষ্ট হতে থাকে। আর তালাকের বিধান তখনই দেওয়া হয়েছে, যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার মতবিরোধ সমাধানের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায় এবং ক্ষতি ও অনিষ্ট প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায় বিচ্ছেদ। ইসলামে তালাকের আশ্রয় তখনই নেওয়া হয়, যখন দ্বন্দ্বের কোনো প্রতিকার করা যায় না এবং সম্পর্ক জোড়া লাগানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদাচরণের ভিত্তিতে জীবনযাপন করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা এমন কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা নিসা ১৯)

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে সম্পূর্ণরূপে ঘৃণা না করে। যদি তার কোনো একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, তবে অন্য কোনো স্বভাব অবশ্যই তার ভালো লাগবে।’ (সহিহ মুসলিম ১৪৬৯)

তালাকের পরিণতি সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকুন। এর ভবিষ্যৎ ফল নিয়ে চিন্তা করুন। এমন কারণ সৃষ্টি না হলে, যার সমাধান কেবল তালাকই হতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত তালাকের অধিকার প্রয়োগ করবেন না। কারণ তালাক একটি নিয়ন্ত্রিত অধিকার। এর জন্য শরিয়তে নির্ধারিত সীমা ও শর্ত রয়েছে। শরিয়তের একটি নীতি হলো, কোনো অধিকার অপব্যবহার করা বৈধ নয়।

শরিয়তসম্মত তালাকের অন্যতম বিধান হলো, স্বামী তার স্ত্রীকে এমন পবিত্র অবস্থায় এক তালাক দেবে, যে পবিত্র অবস্থায় তার সঙ্গে সহবাস করেনি। অথবা স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয়, তবে তাকে এক তালাক দেবে। এরপর স্ত্রীকে বৈবাহিক বাসস্থানেই থাকতে দেবে, যাতে উভয়েই নিজেদের বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে পারে। হয়তো এরপর আল্লাহ নতুন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি করবেন। অর্থাৎ স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে পরিবারের অবস্থা পুনরায় সংশোধন করতে পারবেন।

হে আল্লাহর বান্দারা! এক কথায় তিন তালাক দেওয়া হারাম। একই বৈঠকে একাধিক তালাক দেওয়া হারাম। একই পবিত্র অবস্থায় একাধিক তালাক দেওয়াও হারাম। অনুরূপভাবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত হলো, স্ত্রীর মাসিক অবস্থায় তালাক দেওয়া। আবার এমন পবিত্র অবস্থায় তালাক দেওয়াও শরিয়তবিরোধী, যে পবিত্র অবস্থায় তার সঙ্গে সহবাস হয়েছে।

প্রত্যেক মুসলমানের উচিত, তালাক শব্দ ব্যবহারে অবহেলা না করা। এটিকে শপথের মতো ব্যবহার না করা। কোনো কাজ করাতে, কোনো কাজ থেকে বিরত রাখতে, কোনো বিষয়ে সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করতে তালাকের শপথ করা উচিত নয়। যেমন কেউ বলে, ‘তালাক, তুমি যদি অমুক স্থানে না যাও’, অথবা ‘তুমি যদি অমুক কাজ না করো’। মানুষের মুখে এ ধরনের কথা কতই না বেশি শোনা যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। তোমরা এগুলো লঙ্ঘন করো না। আর যারা আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, তারাই জালেম।’ (সুরা বাকারা ২২৯) তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে উপহাসের বস্তু বানিয়ো না।’ (সুরা বাকারা ২৩১)

হে মুসলমানরা! স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপর ধৈর্য ধারণ করা, চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং হঠাৎ আবেগপ্রসূত ও নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিক্রিয়া থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। তালাকের বিধানের মধ্যে এটিও রয়েছে যে, সংসারের অবস্থা স্বাভাবিক থাকলে এবং বিচ্ছেদের কোনো শরিয়তসম্মত কারণ না থাকলে স্ত্রীর জন্য তালাক দাবি করা বৈধ নয়।

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে নারী কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধিও হারাম হয়ে যায়।’ (সুনানে আবু দাউদ ২২২৬)

১৭ জুলাই শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছন

মুফতি আতিকুর রহমান