এনএসসির আয়

দুষ্টচক্র দুর্নীতির অবসান হোক

খেলাধুলায় জাতীয় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত টাকার অভাবের কথা বলা হয়। কেবল ক্রিকেটে জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলগুলো বৈশ্বিক মানের দিক থেকে কিছুটা ভালো অবস্থায় থাকায় সেখানে টাকার সংকট কম। এর বাইরে ফুটবল, সাঁতার, হকি, দাবাসহ প্রায় সব ধরনের খেলায় অর্থসংকট মারাত্মক। ক্রীড়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এবং অনেক যোগ্য ও মেধাবী ক্রীড়াবিদের অসময়ে হারিয়ে যাওয়ার এটি একটি বড় কারণ। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থসংকট অনেক বেশি। কিন্তু অর্থের সংস্থান না থাকাই যে এর একমাত্র কারণ, তা নয়।

দেশে ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি)। সংস্থাটির অধীনস্থ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে আয়ের সুযোগগুলোর সঠিক তত্ত্বাবধান না হওয়া এবং দুর্নীতি এই অর্থসংকট কাটানো এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে সামনে এসেছে।

দেশ রূপান্তরে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত “বছরে শতকোটি টাকা ‘প্রভাবশালীর’ পকেটে” শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এনএসসির স্থাপনাগুলো থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে শতকোটি টাকা আয়ের সুযোগ আছে। এমন পরিমাণ টাকা লেনদেনও হচ্ছে। কিন্তু এর ক্ষুদ্র অংশ রাজস্ব হিসেবে আসে সংস্থার তহবিলে। বড় অংশই যাচ্ছে ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তিদের পকেটে। সমস্যা হলো, স্থাপনাগুলোর বিভিন্ন অংশ ব্যবহার বাবদ প্রাপ্ত ভাড়ার বড় অংশের তথ্য বা হিসাব এনএসসি কর্মকর্তাদের কাছেও নেই!

গুলিস্তান এলাকায় জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে এনএসসির ৭৪৭টি দোকান আছে। সংস্থার কাগজপত্রে দোকানগুলো বরাদ্দ দেওয়া আছে প্রতি বর্গফুট প্রতি মাসে ২৬ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে শুরু করে ২৯ টাকা ৯৫ পয়সা হিসাবে। কয়েক হাত বদল হয়ে দোকানগুলো থেকে ভাড়া তোলা হয় প্রতি বর্গফুট ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করে। এই অতিরিক্ত টাকা যায় ব্যক্তির পকেটে। এভাবে শুধু জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সের দোকানগুলো থেকে এনএসসি শতকোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এনএসসি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে যে, তাদের অধীনস্থ দোকানগুলোয় ‘শায়েস্তা খান আমলের ভাড়া’ চলছে। একই কমপ্লেক্স এলাকায় অবস্থিত ভাসমান দোকান ও পার্কিং থেকে প্রতি মাসে তোলা লাখ লাখ টাকা জমা হয় না এনএসসিতে।

এনএসসি ভাড়া হিসেবে যে যৎসামান্য টাকা পাওয়ার কথা, তাও পরিশোধ করে না কাগজপত্রে দেখানো অনেক ভাড়াটিয়া। এ কারণে সর্বশেষ হিসাবে, এনএসসির এখনো ৯ কোটি ২০ টাকা পাওনা রয়েছে।  

মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের স্টেডিয়াম ও স্থাপনার ভাড়ার ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে।

আমাদের বক্তব্য হলো, এনএসসির আওতাধীন স্থাপনাগুলো ভাড়া দিতে  যখন চুক্তি করা হয়, তখন এনএসসি কর্তৃপক্ষ মাসে প্রকৃত ভাড়া কত হতে পারে, সম্ভাব্য দোকান মালিকরা বাস্তবে কত টাকা ভাড়া হিসেবে দেন, তা কি যাচাই করেনি? যদি না করে থাকে, কেন করেনি? কাকে সুবিধা দিতে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দোকান কি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়? নাকি মধ্যস্বত্বভোগীরা এনএসসির কাছ থেকে ইজারা নিয়ে অন্যের কাছে মাসিক চড়া অঙ্কে ভাড়া দিয়ে নিজেরা লাভবান হয়? এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজা দরকার।

সব মিলিয়ে সারা দেশে এনএসসির স্থাপনা ব্যবহার থেকে যে আয় হওয়ার কথা, তা কী করে বেহাত হচ্ছে, সেসব বিষয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। সংস্থাটি কী কারণে বঞ্চিত হলো, কারা এর জন্য দায়ী, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।     

এনএসসির আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা হয়। অভিযোগ আছে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সমগ্র চিত্র উঠে আসে না। এ কারণে দোকান ভাড়া, স্টেডিয়াম ও পার্কিং স্থান ব্যবহারের ফি, ইভেন্ট আয়োজনসহ সব ধরনের আয়-ব্যয়ের তথ্য অনলাইনে প্রকাশের দাবি আছে। আমরা মনে করি, দাবিটি যৌক্তিক।

এনএসসির সদিচ্ছা থাকলে আয় বাড়িয়ে স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলায় বাড়তি তহবিল জোগান দেওয়া যাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অতীতে সাফল্য ও অবদান আছে, কিন্তু বর্তমানে দুস্থ জীবনযাপন করছেন, এমন ক্রীড়াবিদ ও সংগঠককে সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। আমরা আশা করি, এনএসসির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এসব বিষয়ে নজর দেবেন।