কারিকুলামে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলকের স্বপ্ন

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশের শিক্ষা কারিকুলামে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যার উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা যেন বিদেশে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও বেশি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে ভাষাজ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। সেই বাস্তবতায়, তৃতীয় ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ অবশ্যই সময়োপযোগী। কিন্তু প্রশ্ন হলো বর্তমান ভাষা শিক্ষার কাঠামো কি তৃতীয় ভাষা শেখানোর জন্য প্রস্তুত! নাকি এর ফলাফল হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার খাতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকার আরেকটি নতুন বিষয় সংযোজন?

বাংলাদেশের ভাষা শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আমরা ভাষাকে যোগাযোগের দক্ষতা হিসেবে না ভেবে এখনো জ্ঞানগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করি। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রায় বারো বছর ইংরেজি শেখে। সে ইংরেজি ব্যাকরণের নিয়ম জানে, পাঠ্যবইয়ের অনুচ্ছেদ পড়ে, পরীক্ষায় উত্তর লিখতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে ইংরেজিতে কথা বলতে গেলে বলে, ‘আই এম জিপিএ ফাইভ’। এর কারণ কি শিক্ষার্থীর মেধার ঘাটতি, নাকি ভাষা শেখানোর পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা? একটি ভাষা শেখার জন্য চারটি মৌলিক দক্ষতা প্রয়োজন শোনা, বলা, পড়া এবং লেখা। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পড়া ও লেখার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। শ্রবণ ও কথনের চর্চা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থী ভাষার নিয়ম আয়ত্ত করে, কিন্তু ভাষার ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ইংরেজি শিক্ষার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রশ্নের উদ্রেক করে, যে শিক্ষাব্যবস্থা একটি আন্তর্জাতিক ভাষাকে কার্যকরভাবে শেখাতে পারছে না, সেই একই কাঠামোর মধ্যে নতুন আরেকটি ভাষা যুক্ত করলে তার ফলাফল কী হবে? ভাষা বই পড়ে মুখস্থ করার কোনো সাধারণ তথ্য নয়। ভাষা একটি সামাজিক অনুশীলন।

ভাষা শেখার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ব্যবহার, শ্রবণ, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং ভুল করার সুযোগ। কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে ভাষা শিক্ষার পরিবেশ এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা শব্দের অর্থ মুখস্থ করে, ব্যাকরণ অনুশীলন করে এবং অনুবাদ করে। কিন্তু সেই ভাষায় চিন্তা করা বা কথা বলার সুযোগ পায় না। তৃতীয় ভাষার ক্ষেত্রেও যদি একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তাহলে নতুন ভাষা কেবল আরেকটি পরীক্ষার বিষয় হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো নতুন ভাষার বর্ণমালা, শব্দভা-ার ও ব্যাকরণ শিখবে; কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই ভাষা ব্যবহার করার সক্ষমতা কতটুকু অর্জন করবে, সেই প্রশ্ন মনের ভেতর থেকেই যায়। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভাষাজ্ঞান আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায়। একজন কর্মী যে দেশে যাচ্ছেন, সেই দেশের ভাষায় প্রাথমিক যোগাযোগ করতে পারলে তার কর্মপরিবেশ সহজ হয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে এবং পেশাগত সুযোগও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সফলতার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা। প্রথমত, তৃতীয় ভাষা শেখানোর আগে ভাষা শিক্ষার দর্শন পরিবর্তন করতে হবে।

ভাষাকে পরীক্ষার বিষয় নয়, দক্ষতা হিসেবে দেখতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি করতে হবে। একটি ভাষা জানা এবং একটি ভাষা শেখাতে পারা দুটি ভিন্ন বিষয়।

তৃতীয়ত, ভাষা শিক্ষায় শ্রবণ ও কথনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের সেই ভাষায় কথা বলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তৃতীয় ভাষা সবার জন্য একইভাবে বাধ্যতামূলক না করে প্রয়োজনভিত্তিক করা যেতে পারে।

বছরের পর বছর ইংরেজি পড়িয়েও যেখানে ব্যবহারিক দক্ষতা তৈরি করা যায়নি, সেখানে যোগ্য শিক্ষক ও সঠিক পদ্ধতি ছাড়া তৃতীয় ভাষা চালু করা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। ঠিকমতো বাংলা ও ইংরেজি  শেখার আগে, অতিরিক্ত আরেকটি ভাষা চাপিয়ে দিলে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়াশোনার মানসিক চাপ বহুগুণ বাড়বে। আমরা যেন বিষয়টি ভুলে না যাই। বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীকে একই ভাষা শেখানোর পরিবর্তে অঞ্চল, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ বিবেচনায় ভাষা নির্বাচন করা অধিক কার্যকর হতে পারে। যে শিক্ষার্থী জাপানে যেতে চায়, তার জন্য জাপানি; যে শিক্ষার্থী কোরিয়ায় কাজ করতে চায়, তার জন্য কোরিয়ান; যে শিক্ষার্থী ইউরোপে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের কথা ভাবছে, তার জন্য সংশ্লিষ্ট ভাষা এভাবে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার্থীদের ওপর না চাপিয়ে, উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক করলে দ্রুত ও কার্যকর সুফল মিলবে এবং সরকারও যথাযথভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

শিক্ষা উন্নত হয় শেখানোর পদ্ধতির কারণে। নতুন বই, বিষয় বা ভাষা যুক্ত করলেই শিক্ষার্থীর দক্ষতা বৃদ্ধি পায় না। প্রয়োজন কার্যকর শিক্ষণ-পদ্ধতি, দক্ষ শিক্ষক এবং বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ। তৃতীয় ভাষা শেখানোর উদ্যোগ শুধু ভাষা সংযোজনের প্রকল্প না হয়ে, ভাষা শিক্ষার সামগ্রিক সংস্কারের অংশ হওয়া প্রয়োজন। ইংরেজি শিক্ষার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি নতুন ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনা করা হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু পুরনো পরীক্ষামুখী কাঠামোর মধ্যে নতুন ভাষা যুক্ত করলে তা কেবল শিক্ষার্থীদের ওপর আরেকটি বোঝা তৈরি করবে।

লেখক : প্রভাষক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)

abedullah.banglaju@gmail.com