প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে আবারও আলোচনায় বসানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীন। আর সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় হয়েছে পাকিস্তান। তবে এই প্রচেষ্টার সামনে এখনো বড় বড় বাধা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের তিনটি সূত্র।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির ইসলামাবাদ সফরের সময় এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। গত ১০ দিনের মধ্যে এটি ছিল তার দ্বিতীয় পাকিস্তান সফর।
পাকিস্তান সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সফরকালে মোমেনি দেশটির শীর্ষ সরকারি নেতা ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইরানের ক্ষমতাধর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে তিনি পরিচিত।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে বসানো সহজ হবে না। দুই দেশের মধ্যে এখনো গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।
এই উদ্যোগে পাকিস্তান এমন এক অবস্থায় পড়েছে, যেখানে দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে।
একদিকে সৌদি আরব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গত বছর দুই দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদির আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করায় পাকিস্তান সেই হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদারদের একটি হলো চীন। বেইজিং চায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত শেষ হোক, যাতে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হয়।
এ কারণেই একদিকে সৌদি আরবের স্বার্থ, অন্যদিকে চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগ- দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে ইসলামাবাদকে।
চীন কেন এত আগ্রহী?
পাকিস্তানের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সাম্প্রতিক হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ।
চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটির রপ্তানি করা তেলের প্রধান ক্রেতা। তাই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে বেইজিং সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, পাকিস্তান ও অন্য দেশগুলোর মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে তারা সমর্থন করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ চালিয়ে যাবে।
চীনে গিয়ে আলোচনা করেন ইসহাক দার
পাকিস্তানের তিনটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে চীন সফরের সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও ইসহাক দার কিংবা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
আগের শান্তি উদ্যোগ কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
গত জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। পরিকল্পনা ছিল, ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথ তৈরি করা হবে।
কিন্তু পরোক্ষ আলোচনা থেকে কোনো অগ্রগতি আসেনি। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তোলে। এরপর আবারও সংঘাত শুরু হয়।
নতুন করে জটিলতা তৈরি করেছে হুথিদের হামলা
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) হুথিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এ কারণে পাকিস্তানের নতুন মধ্যস্থতার উদ্যোগ আরও কঠিন হয়ে গেছে।
পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের ওপর হামলা বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নতুন কোনো আলোচনা শুরু হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান ইতোমধ্যেই এই বার্তাটি ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স