পশ্চিম তীরে ভয়াবহ সংঘর্ষ, নিহত একই পরিবারের ৪ ফিলিস্তিনি

অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের একটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় চার ফিলিস্তিনি এবং এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী নিহত হয়েছেন। স্থানীয় ফিলিস্তিনি অধিবাসীরা জানিয়েছেন, এই হামলায় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও সরাসরি অংশ নেয়। ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।

নাবলুস শহরের কাছে অবস্থিত ফিলিস্তিনি গ্রাম তেলে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ ঘটনাটি চলতি বছর পশ্চিম তীরে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা ইসরায়েল-সমর্থিত বসতি স্থাপনকারী এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।

ঘটনার পরপরই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ঘোষণা দিয়েছে যে তারা নাবলুস শহর ঘেরাও করে পশ্চিম তীরে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তি দিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।’ তারা শুক্রবার (২৪ জুলাই) পশ্চিম তীরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন, তেল গ্রামে অভিযুক্তদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, অস্ত্র উদ্ধার এবং গ্রামবাসীদের কাজের পারমিট বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন।

গ্রামের একজন ফিলিস্তিনি বাসিন্দা জানান, সকালে প্রথমে একদল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তাদের গ্রামে প্রবেশ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সঙ্গে সামরিক বাহিনী যোগ দেয়। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা সেখানে ট্র্যাকিং বা হাইকিংয়ে যাওয়া ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের উদ্ধারে গিয়েছিল।

তেল গ্রাম পরিষদের প্রধান ওয়ালিদ জিদান বার্তাসংস্থা এএফপি-কে জানান, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় ২০ জন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী গ্রামে প্রবেশ করে। জিদান বলেন, ‘গ্রামবাসীরা নিজেদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি রক্ষায় এগিয়ে এলে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ ও হাতাহাতি শুরু হয়।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘সেখানে উপস্থিত ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে মিলে ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালাতে শুরু করে। বসতি স্থাপনকারীরা মূলত মানুষ হত্যা, ভাঙচুর ও সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছিল।’

ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘দখলদার বাহিনীর সহযোগিতায় বসতি স্থাপনকারীদের ঘটানো গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাশের একটি মাঠে একাধিক ফিলিস্তিনি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন। তবে গোলাগুলির সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়া যায়নি।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে, তেল গ্রামের কাছে অবস্থিত হাভাত গিলাদ নামক বসতির কাছে হাইকিং করতে যাওয়া বেসামরিক ইসরায়েলিদের ওপর হামলার খবর পেয়ে তারা সেনা পাঠায়। সেনাবাহিনীর দাবি, হামলাকারীরা ঘটনাস্থলে থাকা এক নিরাপত্তা কর্মীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করেছিল।

রামাল্লার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত ৪ ফিলিস্তিনিই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নিহত চারজনই একই পরিবারের সদস্য এবং তাদের পদবি এক।

অন্যদিকে, নিহত ইসরায়েলি নাগরিকের নাম বেনায়াহু মেলেট (৩২)। তিনি হাভাত গিলাদ বসতির বাসিন্দা ছিলেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা তেল গ্রামটিকে ‘মুছে ফেলার’ জন্য হামলা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরায়েলের চরমপন্থী ও বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থক অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বলেছেন, তেল, ইরাক বুরিন এবং বেইত ফুরিক গ্রামগুলোর অবস্থা ‘নাবলুস ও তুলকারে মের শরণার্থী শিবিরগুলোর মতো হওয়া উচিত।’

উল্লেখ্য, গত বছর নাবলুস ও তুলকারেমে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সব বসতি স্থাপনই সম্পূর্ণ অবৈধ।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, তারা আহত ৪ ফিলিস্তিনির চিকিৎসা দিচ্ছেন, যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে, ইসরায়েলের উদ্ধারকারী সংস্থা জানিয়েছে, আহত দুই ইসরায়েলিকে আকাশপথে উদ্ধার করে পশ্চিম তীর থেকে নেওয়া হয়েছে।