বাজারে মিলছে না ইলিশ

ভরা মৌসুমে রুপালি ইলিশের রুপালি ছটায় যে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো মুখরিত থাকার কথা, সেখানে এখন হাহাকার আর চরম মন্দার ছায়া। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে উপকূলীয় জেলেরা আশা নিয়ে নদীতে নামলেও জাল ফেলে শূন্য হাতেই ফিরতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে মৎস্য আড়তে নেই আগের সেই কর্মচাঞ্চল্য, খুচরা বাজারেও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে নেই কোনো স্বস্তি। নদী ও সমুদ্রে মাছের প্রবেশপথ রুদ্ধ হওয়া, আশঙ্কাজনকভাবে নাব্য হ্রাস এবং অসাধু চক্রের হাতে অবাধে জাটকা নিধনের কারণে দেশে রুপালি ইলিশের উৎপাদন টানা কমছে। এর প্রভাবে কেবল বাজারেই আগুন লাগেনি, ইলিশের এই টানা সংকটে চরম হুমকির মুখে পড়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকা এবং দেশের একক বৃহত্তম জাতীয় মৎস্য সম্পদ।

বরিশালের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্ট রোডে বর্তমানে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। আড়তদারদের তথ্যানুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দেড়শ মণ ইলিশ আমদানি হতো, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ৩০ মণে। বরিশাল মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জহির সিকদার ও আড়তদার মো. সেলিমের ভাষ্য মতে, তীব্র সংকটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী এখন বেকার। গত দুই বছরে মাছের আকাল ও ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে বরিশালে অন্তত ৪০ জন পাইকারি ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। জহির সিকদার বলেন, আগে যে সময় ইলিশের চাপে তারা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়ার সময় পেতেন না, এখন সেই আড়তে কোনো মাছই নেই। ছোট মাছ (জাটকা ইলিশ) ধরা বন্ধ না হলে এই আকাল স্থায়ী রূপ নেবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ইলিশ উৎপাদনের একটি আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল। তবে এর পরপরই দেশে ইলিশ উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় পঁাঁচ লাখ ২৯ হাজার টনে, অর্থাৎ এক বছরেই ঘাটতি হয় ৪২ হাজার টন। পরের অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে এসে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ টনে। সব মিলিয়ে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশের মোট ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তাদের চরম আশঙ্কা, চলমান সংকটের কারণে এবারও উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের ঘর স্পর্শ করা বেশ কঠিন হবে।

উৎপাদন কমার পাশাপাশি বাজারে আসা মাছের গড় আকারেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে জাটকা বাদে একটি সাধারণ ধরা পড়া ইলিশের গড় ওজন হতো ৫০০ থেকে ৫৫০ গ্রাম, যা বর্তমানে নেমে এসেছে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামে।

সংকটের কারণে বাজারে ইলিশ মাছের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে বাজারে এক কেজির বেশি ওজনের নদীর ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২৭০০ থেকে ২৮০০ টাকা কেজি দরে। আটশ থেকে নয়শ গ্রাম ওজনের মাছের দাম কেজিপ্রতি ২৩০০ থেকে ২৪০০ টাকা। অন্যদিকে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট সাইজের ইলিশ কিংবা জাটকা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। বাজারে আসা ক্রেতা সেলিমা বেগম হতাশা প্রকাশ করে জানান, ইলিশ এখন মধ্যবিত্তের জন্য রূপকথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চড়া দাম দিয়েও মানসম্মত সাধারণ মাছ মিলছে না।

সরকারি টানা নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হয়েছে দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে। আশা ছিল এবার জালে প্রচুর ইলিশ মিলবে, কিন্তু বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। তালপুটি তলাসহ নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রলার নিয়ে অবস্থান করে জাল ফেললেও তেলের খরচও তুলতে পারছেন না জেলেরা। জেলে মো. হাকিম, হারুন সিকদার ও মো. জসিম জানান, মাছ না পাওয়ায় দিন শেষে ট্রলারের তেল ও লোকবলের খরচের দেনা মেটাতে গিয়ে তারা মহাজনের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ডক্টর হাফিজ আশরাফুল হকের মতে, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণেই এই দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ঘটছে। নদ-নদীর মোহনায় নাব্য কমে যাওয়া এবং প্রচুর ডুবোচর সৃষ্টির কারণে সাগরের মিষ্টি পানির টানে ডিম ছাড়তে আসা ইলিশের প্রাকৃতিক পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। পানি কম থাকায় পথ পরিবর্তন করছে ইলিশ। এর পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে অসাধু চক্রের মাধ্যমে ক্রমাগত রেণু ও জাটকা নিধন হওয়ায় বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মোহসীন ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান জানান, সাগর থেকে মিষ্টি পানিতে ইলিশের প্রবেশের হার কমে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে নদীতে নিয়মিত ড্রেজিং, প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে। তা না হলে জাতীয় সম্পদ ইলিশের উৎপাদন ও ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।