বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের অন্যতম মাধ্যম অ্যাসাইনমেন্ট। একটি অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের দিনের পর দিন সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। সেটি জমা দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ভুলত্রুটি ধরে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের খাতা ফেরত দেওয়া হয় না। মেলে না শিক্ষকদের গঠনমূলক মন্তব্য বা ভুলত্রুটির বিশ্লেষণও। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, এতে অ্যাসাইনমেন্টের মূল উদ্দেশ্য শেখা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। আর মূল্যায়ন শেষে শিক্ষার্থীদের না দিয়ে অনেক খাতাই কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে ভাঙারির দোকানে।
রাবির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি সেমিস্টারে একাধিক কোর্সে ৫০ থেকে ৬০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়। শিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা অনেক খাটাখাটনি করে বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রস্তুত করতে হয়। এতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগে। অ্যাসাইনমেন্ট তৈরিতে সময়ের পাশাপাশি কাগজ, প্রিন্টিং ও বাঁধাইয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থও খরচ হয়। কিন্তু মূল্যায়নের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা খাতা ফেরত পান না। ফলে কোথায় ভুল হয়েছে, কোন জায়গায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে কিংবা শিক্ষক কী মন্তব্য করেছেন তা জানার সুযোগও থাকে না।
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বর্ষেই আমাদের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হয়। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন আমরা কখনোই পাই না। অনেক ক্ষেত্রে সিজিপির ভিত্তিতে অ্যাসাইনমেন্টের নম্বর দেওয়া হয়। অথচ একটি অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করতে আমাদের সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। খাতায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও মন্তব্য লিখে ফেরত দিলে তা শেখার জন্য অনেক বেশি কার্যকর হতো।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ্ গালিব। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ৫০ পৃষ্ঠার অ্যাসাইনমেন্ট দিতে বলা হয়। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে কঠোর পরিশ্রমে সেগুলো লিখি। কিন্তু সেই পরিশ্রমের ফসল শেষ পর্যন্ত আমাদের হাতে ফিরে আসে না। বিভাগ চাইলে ভালো অ্যাসাইনমেন্টগুলো সেমিনার লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে।’
ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এবং গবেষক এস এম তাহমিদ হাসান বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্টের খাতাগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করা উচিত। পরে প্রয়োজন হলে পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যতে এগুলো গবেষণারও উপকরণ হতে পারে।’
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদেরও অনেকে মনে করেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নের শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা খাটাখাটনি ও অর্থ ব্যয় করে অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুত করলেও অনেক শিক্ষক সেগুলো যথাযথভাবে পড়েন না, গঠনমূলক মন্তব্যও দেন না। মূল্যায়ন শেষে শিক্ষার্থীদের কাছে খাতা ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বিক্রি করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের অবমূল্যায়ন।’
নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. মো. মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্টের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বৃদ্ধি করা। কিন্তু অনেক শিক্ষক খাতা মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিচ্ছেন না। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ভালো অ্যাসাইনমেন্ট অন্যদের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। তাই মানসম্মত অ্যাসাইনমেন্ট সংরক্ষণ করা উচিত। আমি কখনো অ্যাসাইনমেন্টের খাতা বিক্রি করিনি। মূল্যায়নের পর খাতাগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে ফেরত দেওয়া হলে তারা নিজেদের ভুলত্রুটি থেকে শেখার সুযোগ পেত।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল্যায়নের পর দীর্ঘদিন সংরক্ষণের নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অনেক বিভাগ অ্যাসাইনমেন্টের খাতা ভাঙারির দোকানে কেজি দরে বিক্রি করে দেয়। বিনোদপুর এলাকার ভাঙারি ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রতি বছরই অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষার খাতা ও নানা ধরনের কাগজপত্র কেজি দরে বিক্রি করা হয়।’
শিক্ষার্থীদের দাবি, মূল্যায়নের পর অ্যাসাইনমেন্টের খাতা ফেরত দেওয়া, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ এবং ধাপে ধাপে ডিজিটাল সাবমিশন চালু হলে কাগজের অপচয় কমবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগের সেরা অ্যাসাইনমেন্টগুলো বিভাগীয় আর্কাইভ বা সেমিনার লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
এ বিষয়ে রাবির উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ও ভাইভা সবই শিক্ষার্থীদের পাঠদানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মূল্যায়নের পর খাতায় ভুলগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষার্থীদের কাছে ফেরত দেওয়া সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। পাশাপাশি মানসম্মত কিছু অ্যাসাইনমেন্ট বিভাগে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের শেখার ও মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মূল্যায়নের পর খাতাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং ফিডব্যাকসহ শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা অধিক যুক্তিযুক্ত। খাতা বিক্রির মতো কোনো ঘটনা ঘটলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’