দাবানলে পুড়ছে ফ্রান্স-স্পেন, ঘরছাড়া আড়াই লাখের বেশি মানুষ

ইউরোপের দুই দেশ ফ্রান্স ও স্পেনে ভয়াবহ দাবানলের তাণ্ডবে এখন পর্যন্ত আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তীব্র তাপপ্রবাহ ও প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর বোর্দোর দিকে আগুন এগিয়ে যাওয়ায় নতুন করে বেশ কয়েকটি শহরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বোর্দোর পশ্চিমে অন্তত সাতটি শহরের বাসিন্দাদের রাতেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরোন্দ ও লঁদ অঞ্চলে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দাবানল মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাসদস্যরা ঝোপঝাড় পরিষ্কার ও আগুনের বিস্তার ঠেকাতে ফায়ারব্রেক তৈরির কাজ করছেন।

শনিবার সকাল পর্যন্ত দাবানলটি বোর্দো শহর থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করলেও প্রবল বাতাসে ধোঁয়া শহরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাতাসে তীব্র পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া মানুষের জন্য বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা হয়েছে।

MixCollage-25-Jul-2026-11-16-PM-6567

দাবানল থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে সরে আসা পর্যটক স্পেন্সার র‌্যান্ডাল জানান, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রায় ১০০ মাইল দূরে আশ্রয় নিলেও সেখান থেকেও আগুনের ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রবল বাতাস আগুনকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ।

এদিকে বোর্দোতে বেড়াতে যাওয়া এক ব্রিটিশ দম্পতি জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায়। বাড়ির সুইমিংপুল ছাইয়ে ঢেকে গেছে এবং বাইরে হাঁটলে পায়ে কালো ছাই লেগে যাচ্ছে। ধোঁয়া এতটাই ঘন যে তা শ্বাস-প্রশ্বাসে তীব্র প্রভাব ফেলছে।

দাবানলের কারণে রবিবার অনুষ্ঠিতব্য বিখ্যাত সাইকেল প্রতিযোগিতা ট্যুর দ্য ফ্রান্স-এর শেষ ধাপ ১৩৩ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৮৯ কিলোমিটার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দাবানল-আক্রান্ত এলাকায় মোতায়েনের সুবিধার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকছেন। দেশজুড়ে প্রায় ৩০টি দাবানল জ্বলছে, যা সরকার নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানান, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে ৯৮ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে।

অন্যদিকে স্পেনে দাবানলের কারণে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। রাজধানী মাদ্রিদের আশপাশে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক সরকার। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সতর্ক করে বলেছেন, সামনে এখনও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদ ও আভিলা অঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আরও ২৮ হাজারের বেশি মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে বাধ্য রয়েছেন। এদিকে ভ্যালেন্সিয়ার মানিসেস এলাকায় দাবানলে নিজের গাড়ির ভেতর থেকে সত্তরোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

MixCollage-25-Jul-2026-11-17-PM-5988

মাদ্রিদের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো এই দাবানলকে অঞ্চলের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ জানান, চলতি বছরে স্পেনে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টরের বেশি ভূমি পুড়ে গেছে, যা গত এক দশকের বার্ষিক গড়ের চেয়েও বেশি।

ইতালির সিসিলি দ্বীপেও শত শত দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি স্কটল্যান্ডের কেয়ার্নগর্মস ন্যাশনাল পার্কে টানা ১০ দিন ধরে জ্বলতে থাকা দাবানল মোকাবিলায় বড় ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংকট ব্যবস্থাপনা কমিশনার হাদজা লাহবিব সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছরে ইউরোপে দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি জানান, দাবানলের মৌসুম এবার স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হয়েছে এবং সামনে আরও তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস থাকায় নতুন নতুন দাবানলের আশঙ্কাও রয়েছে।

ফ্রান্সের সহায়তায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন ব্যবস্থার আওতায় ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া ও রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অগ্নিনির্বাপণ বিমান, হেলিকপ্টার ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন জানান, ইইউর যৌথ অগ্নিনির্বাপণ বহর থেকেও ফ্রান্স ও স্পেনে অতিরিক্ত বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি