আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের পর্দা ফাঁস

বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যেন হঠাৎ করেই আর্জেন্টিনাবিরোধী এক বিশাল তরঙ্গ শুরু হয়েছে সারা বিশ্বে। একের পর এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, খেলোয়াড় ও সংবাদমাধ্যম আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এ কি কেবলই ক্ষোভের কোনো স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা প্রোপাগান্ডা মিশন?

বিখ্যাত আর্নেস্টো জোসেফ গোয়েবলসের সেই ৮০ বছর পুরোনো তত্ত্ব তুলে ধরে আর্জেন্টাইন সাংবাদিক জোনাতান ভিয়ালে গণমাধ্যম 'তোদো নোতিসিয়া'-এ এক বিশ্লেষণাত্মক কলামে এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে দেশটির বিরুদ্ধে এক গভীর চক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।*

নাৎসি জার্মানির প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস বলেছিলেন, "একটি মিথ্যা যদি হাজার বার পুনরাবৃত্তি করা হয়, তবে তা সত্যে পরিণত হয়।" আর্নেস্টো ভিয়ালের মতে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ঠিক এই কৌশলটিই প্রয়োগ করা হচ্ছে। বার্তাকে সহজ করা, একই স্লোগানের পুনরাবৃত্তি, মানুষের আবেগকে উসকে দেওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট 'শত্রু' চিহ্নিত করার মাধ্যমে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। আর এই প্রচারণার শিকার করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদীয়মান 'ওক' সংস্কৃতি দ্বারা, যেখানে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

তোদো নোতিসিয়াসের প্রতিবেদনে এমন ১০ জন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির নাম ও তাদের মন্তব্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে, যারা সম্প্রতি আর্জেন্টিনার ওপর আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন:

১. হোসাম হাসান (মিশরীয় কোচ): "আর্জেন্টিনা আমাদের ম্যাচটি চুরি করে নিয়ে গেছে।"

 ২. জোহরান মামদানি (নিউ ইয়র্কের মেয়র): দাবি করেন, মিশরকে আর্জেন্টিনার মাধ্যমে "ডাকাতি" করা হয়েছে।

 ৩. মেক্সিকান মিডিয়া ও আলভারো মোরালেস: মেক্সিকোর সাংবাদিকদের এক অংশ ও আলভারো মোরালেস আর্জেন্টাইনদের অহংকারী, সহিংস ও বর্ণবাদী' আখ্যা দিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের "ক্যারিকেচার" বলে খোঁচা দেন।

 ৪. স্যামুয়েল এল. জ্যাকসন (হলিউড অভিনেতা): দাবি করেন, "ইতিহাসগতভাবেই আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম বর্ণবাদী দেশ।" একই সুর মেলান মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসমিন ক্রকেট।

৫. মিয়া খলিফা (প্রাক্তন পর্ন তারকা): মন্তব্য করেন, "মেসিকে আর এক মুহূর্তও এই বিশ্বকাপে দেখতে চাই না।"

৬. পিয়ার্স মরগান (ব্রিটিশ সাংবাদিক): আর্জেন্টাইন দলকে "সহিংস ও ফুটবলের জন্য কলঙ্ক" বলে মন্তব্য করেন এবং আর্জেন্টিনার পরাজয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন।

 ৭. আর্তুরো পেরেজ-রেভের্তে (স্প্যানিশ প্রাবন্ধিক): আর্জেন্টিনার খেলার ধরণকে "অসভ্য ও নোংরা" বলে সমালোচনা করেন।

 ৮. হাভিয়ার বারদেম (হলিউড ও স্প্যানিশ অভিনেতা): রাজনৈতিক সরলীকরণ করে আর্জেন্টিনাকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা করেন।

 ৯. ডেইলি মেইল স্পোর্ট (ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম): মেসি ও আর্জেন্টাইন দলকে চরমভাবে অপমান করে শিরোনাম প্রকাশ করে।

১০. রোসালিয়া, আইশোস্পিড, ইবাই ও ক্লাউদিয়া শেইনবাম: ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই একই ধরনের আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা 'ন্যারেটিভ' বা প্রচারণায় ইন্ধন জুগিয়েছেন।

স্যামুয়েল এল. জ্যাকসনসহ পশ্চিমাদের বর্ণবাদের অভিযোগের কড়া জবাব দিয়ে কলামে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যখন বাসে কৃষ্ণাঙ্গদের বসা নিষিদ্ধ করেছিল বা তাদের জন্য আলাদা পার্ক ও শৌচাগার রাখত, তখনও আর্জেন্টিনায় আইনগতভাবে তাদের সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকার ছিল।

আর্জেন্টিনায় দারিদ্র্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক কোন্দল বা অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থাকতে পারে, তবে এখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা পদ্ধতিগত বর্ণবাদ নেই। প্রায় ২০০ বছর ধরে ইতালীয়, স্প্যানিশ, ইহুদি, তুর্কি, আরব, চীনা ও কৃষ্ণাঙ্গরা একত্রে একই টেবিলে বসে আড্ডা দিচ্ছে এবং সেখানে কোনো বর্ণগত জটিলতা নেই।

হঠাৎ কেন আর্জেন্টিনা পুরো বিশ্বের কাছে খলনায়ক হয়ে উঠল? তোদো নোতিসিয়ার কলামে জোর দিয়ে বলা হয়, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। অভিনেতা, গায়ক, ইনফ্লুয়েন্সার, রাজনীতিবিদ, এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্ট এবং গণমাধ্যমগুলো যেভাবে একই চিত্রনাট্য, একই ভাষার ব্যবহার এবং একই তথাকথিত 'নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব' প্রকাশ করছে—তা স্পষ্টত এক বিশাল 'সাংস্কৃতিক যন্ত্রের' কাজ।

নিজেদের দেশের বর্ণবাদ, ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতেই পশ্চিমের একদল প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আর্জেন্টিনাকে বলির পাঁঠা বানাচ্ছে বলে তোদো নোতিসিয়ার এই বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।