সময় আল্লাহর দেওয়া আমানত

জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ কী? অনেকে বলবেন অর্থ। কেউ বলবেন ক্ষমতা। কেউ আবার বলবেন সুস্বাস্থ্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। কারণ, অর্থ হারালে তা আবার উপার্জন করা যায়। সম্মান নষ্ট হলেও অনেক সময় তা ফিরে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্ত কখনোই ফিরে আসে না। তাই সময়ই মানুষের প্রকৃত জীবন-পুঁজি। একজন মুমিন জানেন, প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই আমানতের হিসাব একদিন তাকে দিতেই হবে। তাই তিনি সময়কে আখেরাতের পুঁজি বানানোর চেষ্টা করেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বিভিন্ন সময়ের শপথ করেছেন। কখনো ফজরের। কখনো রাতের। আল্লাহ তার কোনো সৃষ্টির শপথ করলে সেটি ওই বিষয়ের বিশেষ গুরুত্ব প্রকাশ করে। সুরা আসরে তিনি বলেন, ‘সময়ের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তবে তারা ব্যতীত, যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আসর ১-৩) এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, সময়ের সঠিক ব্যবহারই মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার অন্যতম মাপকাঠি।

সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া পবিত্র আমানত। পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এ সময় শেষ হলে আর একটি মুহূর্তও বাড়ানো হবে না। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষণ মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা এক কদমও নড়বে না, যতক্ষণ না তাকে তার জীবন কীভাবে কাটিয়েছে এবং যৌবন কোথায় ব্যয় করেছে সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি) এই হাদিস একজন মুমিনকে সময়ের ব্যাপারে গভীর দায়িত্ববোধ শেখায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু অর্থ হারানো নয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, এমন একটি দিন পার করে দেওয়া, যেদিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো আমল করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকা ও লোকসানের মধ্যে রয়েছে। একটি হলো সুস্থতা, অন্যটি অবসর।’ (সহিহ বুখারি) অবসর সময় যদি অর্থহীন কাজে নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেটিই প্রকৃত লোকসান। কারণ, সেই সময় আর কখনো ফিরে আসবে না।

একজন মুমিন দিনের শুরু করেন আল্লাহর স্মরণ দিয়ে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তার সময় ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু। নামাজ সময়মতো আদায় করলে পুরো দিনের কাজও শৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসে। প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তেলাওয়াত, এর অর্থ বোঝা এবং তা অনুযায়ী জীবন গঠনের চেষ্টা একজন মুমিনের দৈনন্দিন অভ্যাস হওয়া উচিত।

সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হওয়া উচিত উপকারী জ্ঞান অর্জনে। দ্বীনি জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি জীবনের প্রয়োজনীয় দুনিয়াবি জ্ঞানও গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুমিন এমন জ্ঞান অর্জন করেন, যা তার নিজের উপকারে আসে এবং সমাজেরও কল্যাণ বয়ে আনে। কারণ, জ্ঞানহীন ইবাদত যেমন অপূর্ণ, তেমনি জ্ঞানহীন সমাজও দুর্বল।

হালাল উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব। ইসলাম অলসতা পছন্দ করে না। নবীজি (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরাম কর্মমুখর জীবনযাপন করেছেন। তারা ইবাদত করেছেন, আবার পরিশ্রমও করেছেন। তাই সময়ের একটি অংশ হালাল জীবিকা অর্জনের জন্য ব্যয় করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।

মানুষের উপকারে সময় ব্যয় করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজকল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়া, সৎকাজের আহ্বান জানানো এবং মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে ভূমিকা রাখা সময়ের উত্তম ব্যবহার। যে সময় অন্যের কল্যাণে ব্যয় হয়, তা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে কিছু কাজ সময়কে নিঃশেষ করে দেয়। অযথা আড্ডা, অনর্থক বিতর্ক, গিবত, অর্থহীন বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যহীন সময় কাটানো মানুষের জীবন থেকে অজান্তেই মূল্যবান মুহূর্তগুলো কেড়ে নেয়। একজন সচেতন মুমিন এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। তিনি জানেন, প্রতিটি মুহূর্ত হয় তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে, নয়তো বিপক্ষে।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক