মানবজীবনের সবচেয়ে কোমল, সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব। শিশুর ভবিষ্যৎ জীবন কেমন হবে, তার চিন্তাচেতনা, চরিত্র, আদর্শ ও আচরণ কেমন হবে, সেটার ভিত্তি গড়ে ওঠে শৈশবেই। আর এই গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন মা-বাবা। সন্তান পৃথিবীতে আসার পর তার প্রথম শিক্ষাগুরু মা-বাবা। তাদের ভালোবাসা, আদর, শিক্ষা, শাসন ও দিকনির্দেশনাই শিশুর জীবনকে সুন্দর ও সফল করে তোলে।
ইসলাম শিশুর সুশিক্ষা ও সুন্দর লালন-পালনের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম ৬) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করা মা-বাবার অন্যতম বড় দায়িত্ব।
শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম প্রয়োজন ভালোবাসা ও নিরাপত্তাবোধ। একটি শিশু যখন পরিবারে স্নেহ, মমতা ও আন্তরিকতা পায়, তখন তার মন সুন্দরভাবে বিকশিত হয়। মা-বাবার হাসিমুখ, আদর ও সময় শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে অবহেলা বা কঠোরতার মধ্যে বড় হয়, তাদের মধ্যে অনেক সময় ভয়, হতাশা ও মানসিক সংকট তৈরি হয়। তাই সন্তানকে ভালোবাসা দিতে হবে, তবে সেই ভালোবাসা হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ।
মায়ের ভূমিকা শিশুর জীবনে সবচেয়ে গভীর। একজন মা তার সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়। শিশুর ভাষা শেখা, আচার-আচরণ, নম্রতা, ভদ্রতা ও ধর্মীয় শিক্ষা অনেকাংশেই মায়ের কাছ থেকে আসে। একজন নেককার মা একটি আদর্শ সমাজ গঠনের ভিত্তি। ইতিহাসে অসংখ্য মনীষীর পেছনে মায়ের অবদান ছিল অনন্য। মা যদি সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেন, তাহলে সে ভবিষ্যতে একজন আদর্শ মানুষ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে বাবার দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা পরিবারের অভিভাবক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি। সন্তানের জন্য হালাল রিজিক উপার্জন, তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং জীবনের বাস্তব শিক্ষা দেওয়া বাবার অন্যতম কর্তব্য। বাবা যদি সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন এবং তাকে সময় দেন, তাহলে সন্তান আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক বাবা সন্তানকে সময় দিতে পারেন না। ফলে সন্তান মোবাইল, ইন্টারনেট বা খারাপ বন্ধুর প্রভাবে বিপথে যেতে পারে। তাই সন্তানের পাশে থাকা এবং তার মন বুঝতে চেষ্টা করা জরুরি।
শিশুর নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও মা-বাবার ভূমিকা অপরিসীম। শিশুকে ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর পরিচয়, নবীজির আদর্শ, নামাজ, রোজা ও ইসলামি আখলাক শিক্ষা দিতে হবে। কারণ শিশুর মন কোমল, ছোটবেলায় যা শেখানো হয় তা সহজে হৃদয়ে গেঁথে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহার শিশুদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। মোবাইল, গেমস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের মনোযোগ নষ্ট করছে। অনেক মা-বাবা সন্তানকে ব্যস্ত রাখার জন্য ছোটবেলা থেকেই মোবাইল হাতে তুলে দেন। এতে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা প্রয়োজন। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী শিখছে, এসব বিষয়ে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে।
শিশুর শিক্ষাজীবনেও মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া, তাকে উৎসাহ দেওয়া এবং নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় মা-বাবা শুধু ভালো ফলাফলের ওপর জোর দেন, কিন্তু চরিত্র গঠনের দিকে খেয়াল করেন না। অথচ একজন সৎ ও চরিত্রবান মানুষ সমাজের জন্য বেশি উপকারী।
শাসনের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন শিশুকে ভীতু ও জেদি করে তোলে, তেমনি অতিরিক্ত প্রশ্রয় তাকে বেয়াদব ও দায়িত্বহীন বানাতে পারে। তাই সন্তানকে ভালোবেসে বুঝিয়ে শাসন করতে হবে। শিশুর ভুল হলে তাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে সংশোধন করা উচিত।
একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতেও মা-বাবার ভূমিকা অপরিহার্য। সন্তানকে সবসময় অন্যের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। এতে তার মনে হীনমন্যতা তৈরি হয়। বরং তার ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে। একজন আত্মবিশ্বাসী শিশু ভবিষ্যতে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
পরিবার হলো শিশুর প্রথম সমাজ। সে পরিবার থেকেই শিখে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে মানুষকে সম্মান করতে হয় এবং কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই মা-বাবা যদি নিজেরাই ভালো চরিত্রের অধিকারী হন, তাহলে সন্তানও তাদের অনুসরণ করবে। কারণ শিশুরা উপদেশের চেয়ে কাজ দেখে বেশি শেখে।
আজকের সমাজে অনেক মা-বাবা দুনিয়াবি সফলতার পেছনে এত বেশি ব্যস্ত যে সন্তানকে সময় দেওয়ার সুযোগ পান না। অথচ সন্তান শুধু খাবার বা পোশাক চায় না, সে চায় মা-বাবার ভালোবাসা, সময় ও সান্নিধ্য। একটি সুন্দর পরিবার একটি সুন্দর শিশুর জন্ম দেয়, আর সুন্দর শিশুরাই গড়ে তোলে আদর্শ সমাজ।
শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে মা-বাবার ভূমিকা অপরিসীম। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান আমানত। এই আমানতের যথাযথ হক আদায় করা প্রত্যেক মা-বাবার দায়িত্ব। ভালোবাসা, সুশিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে সন্তানকে গড়ে তুলতে পারলেই সে দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হবে। তাই প্রতিটি মা-বাবার উচিত, সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া এবং তাকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর