পূর্বাচলে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ আতঙ্কে ২০০ পরিবার

বাড়ির উঠানে পাশাপাশি দুটি কবর। একটি মায়ের, আরেকটি ভাইয়ের। কবর দুটির দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকেন কাজী মাজহারুল আনোয়ার। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, ‘পূর্বাচলে আমার দাদা-নানার কবর ছিল। সরকারি অধিগ্রহণের পর সব ভেঙে সেখানে প্লট বানানো হয়েছে। এখন আবার আমার মায়ের কবরও কি একই পরিণতি পাবে?’

বংশপরম্পরায় পূর্বাচলে বাস করতেন কাজী মাজহারুল আনোয়ার। দাদা, নানাসহ পূর্বসূরিদের অনেকের কবর ছিল সেখানে। সরকারি অধিগ্রহণের ফলে ১৯৯৩ সালে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কবরগুলো মাটির সঙ্গে মিশিয়ে সেখানে প্লট নির্মাণ হয়েছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের ঠাঁই হয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়িয়ায়। এক জীবনে একবার নয়, দ্বিতীয়বার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তার।

শুধু কাজী মাজহারুল আনোয়ার নন, রূপগঞ্জের ফুলবাড়িয়া, শিমুলিয়া, কুলাদি ও ব্রাহ্মণখালী মৌজার অন্তত ২০০টি পরিবারের সামনে এখন একই আশঙ্কা। সরকারি একটি সংস্থার বিশেষ প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩৮ দশমিক ৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। এতে সহস্রাধিক মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি, পারিবারিক কবরস্থান এবং বহু বছরের গড়ে তোলা জীবন-জীবিকা হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গতকাল সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা। স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে একটাই প্রশ্ন একবার উচ্ছেদ হওয়ার পরও কি আবারও আমাদের ঘর ছাড়তে হবে?

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, নব্বই দশকে পূর্বাচল প্রকল্পে সরকারি অধিগ্রহণে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছিলেন তারা। ভেঙে-গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল পূর্বপুরুষের কবর, বসতভিটা আর জীবিকার শেষ সম্বলটুকু। নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের অস্তিত্ব।

কিন্তু তিন দশক পর সেই দুঃস্বপ্ন যেন আবারও ফিরে এসেছে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও একটি সংস্থার অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের নামে আবারও অধিগ্রহণের মুখে পড়েছে তাদের তিলে তিলে গড়ে তোলা বসতভিটা ও আবাদি জমি।

সরকারি একটি সংস্থার বিশেষ প্রকল্পের আওতায় শিমুলিয়া, ফুলবাড়িয়া, কুলাদি ও ব্রাহ্মণখালী মৌজার শতবর্ষী বসতভিটা এবং উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, কোনো ধরনের গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই অত্যন্ত গোপন সার্ভে পরিচালনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নামমাত্র ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে প্রায় সহস্রাধিক মানুষকে আবারও নিঃস্ব করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় নির্ঘুম রাত কাটছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর এলাকার হাজারো মানুষের। কৃষিকাজই যাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই যাদের প্রতিদিনের জীবনযাপন। মাজহারুল আনোয়ার বা আব্দুল মতিনের মতো শিমুলিয়া ও এর আশপাশের শত শত মানুষের জীবন এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে।

অধিগ্রহণ করা হবে ৩৮.৭৬ একর জমি : অভিযোগ রয়েছে, গত এক মাস সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বেশ কয়েকবার আকস্মিকভাবে এলাকাটি পরিদর্শন ও সার্ভে কাজ পরিচালনা করেছে। সংস্থাটির দপ্তরের পরিকল্পনা বিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ভূমির তফসিল (দাগসূচি) অনুযায়ী, রূপগঞ্জ উপজেলার রঘুরামপুর, ব্রাহ্মণখালী, কুলাদি ও শিমুলিয়া মৌজার মোট ৩৮.৭৬ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রঘুরামপুর মৌজায় ১৯.২১ একর, ব্রাহ্মণখালী মৌজায় ১৫.৮৫ একর এবং কুলাদি মৌজায় ৩.৭০ একর জমি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কোনো ধরনের জনমত যাচাই বা গণশুনানি ছাড়াই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই সার্ভে চালানো হয়। নামমাত্র সরকারি রেটে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে গৃহহীন ও কর্মহীন হয়ে পড়বে সহস্রাধিক মানুষ।

পূর্বাচল থেকে একবার উচ্ছেদ হওয়া সায়েম ভূইয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পূর্বাচল থেকে একবার উচ্ছেদ করছে। আবার উচ্ছেদ করার চেষ্টা করতাছে। আমরা কি মানুষ না?’

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় প্রায় ২০০টি পরিবার বসবাস করে। শতাধিক কবরও আছে। ভোটার আছে ১৬শ’র মতো। তাদের বাচ্চাকাচ্চা আছে। এরা কই যাবে? কী করে বেঁচে থাকবে। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’

আরেক ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম মোল্লা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাগো কপাল খারাপ বাজান। উপশহর থেইকা খেদাইয়া দিছে। উপশহরের বাইরে আইয়া বাড়ি করলাম। এহন হুনতাছি সরকারের কারা নাকি আমাগো উচ্ছেদ কইরা দিব। কন দেহি, আমরা আর কই যামু বাপ?’

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, এই মৌজাগুলোর ফসলি জমিগুলো শুধু জীবিকার উৎস নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নামমাত্র দামে জমি অধিগ্রহণের সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক মানুষরা সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়বে।

আমরা এই দেশের মানুষ, নাকি রোহিঙ্গা?: বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে একবার নিঃস্ব হয়েছিলেন কাজী মাজহারুল আনোয়ার। এখন ফের একই পরিস্থিতির মুখে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে গেলে আলাপ হয় কাজী মাজহারুল আনোয়ারের সঙ্গে। তার বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে নীল পলিথিনে মোড়ানো দুটি কবর।

এ তিনি জানান, পূর্বাচল উপশহর থেকে উচ্ছেদ হয়ে রঘুরামপুর মৌজায় এসে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনেছিলেন। ৫ শতক জায়গার ওপর গড়ে তোলা সেই ছোট্ট ঠিকানাও আজ প্রস্তাবিত প্রকল্পের বুলডোজারের মুখে হুমকির মুখে। ভাগ্য যেন বারবার তার সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছে।

চোখেমুখে হতাশা, কপালে দুশ্চিন্তার মেঘ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘আমরা কেমন রাষ্ট্রে বাস করি, যে রাষ্ট্র আমাদের বাসস্থানের নিরাপত্তা দিতে পারে না!’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা কি এই দেশের নাগরিক নাকি রোহিঙ্গা? এখান থেইকা সরায়ে দিলে আমরা কই যামু?’

একটি কবর দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দাদা, নানার কবর ছিল পূর্বাচলে। অধিগ্রহণের পর সেগুলো ভেঙে প্লট বানানো হইছে। এখন আমার গর্ভধারিণী মায়ের কবরটার দিকেও ওরা নজর দিল। আমাদের সরায়ে দিলে মায়ের কবর জিয়ারত কেমনে করমু?’

শিমুলিয়া গ্রামের ভুক্তভোগী বৃদ্ধ আব্দুল মতিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। এই মাটি ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? সরকারি একটি সংস্থা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে আমাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে, যা দিয়ে অন্য কোথাও এক টুকরো জমিও কেনা সম্ভব নয়।’

শুধু ঘর নয়, হারাবে জীবিকাও : স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এই চারটি মৌজার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আবাদি জমিই তাদের প্রধান জীবিকা। জমি চলে গেলে শুধু ঘর নয়, কর্মসংস্থানও হারাবে শত শত পরিবার। পুরো এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে।

উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, কেবল রঘুরামপুর ও কটিয়াদি এলাকার মৌজাগুলোতেই ভোটার সংখ্যা ১৬শ’র ওপরে। সরকারি এই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে বিশাল সংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার, স্থায়ী ঠিকানা ও নাগরিক অস্তিত্ব চরম বিপদের মুখে পড়বে।

প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই এই এলাকার প্রধান ডেমোগ্রাফিক ভিত্তি। সংস্থাটির সার্ভে টিম বারবার এলাকায় আসার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনে স্থানীয় যুবসমাজ ও নারী-পুরুষরা একত্র হয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছেন। তাদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, জীবন দিয়ে হলেও পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে তাদের হটাতে দেওয়া হবে না।

বর্তমানে চারটি মৌজায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের গণআন্দোলনের শঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর একটাই দাবি, উচ্ছেদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের আশু হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সংকটের সুরাহা দেখছেন না স্থানীয়রা। তারা চান সরকারি খাস জমি অধিগ্রহণ করে এই পরিকল্পনা নেওয়া হোক। 

অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখবে প্রশাসন : বিষয়টি সম্পর্কে অবগত বলে জানিয়েছেন রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফরিদ আল সোহান। তিনি জানান, এক মাস আগেই তথ্য যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার চাইলে ভূমি অধিগ্রহণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে, যার জমি নেওয়া হবে, তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণে ক্ষতিপূরণ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত করে দেখব।’