এইচআইভি চিকিৎসা চরম সংকটে

বিশ্বব্যাপী এইচআইভি-এইডস প্রতিরোধ ও চিকিৎসা কর্মসূচি নজিরবিহীন অর্থায়ন সংকটে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টস ইমার্জেন্সি প্লান ফর এইডস রিলিফের (পিইপিএফএআর) অর্থায়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে এইচআইভি চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ৫২ শতাংশ বাস্তবায়নকারী অংশীদারের অন্তত একটি অর্থায়ন চুক্তি বাতিল হয়েছে, ৭৭ শতাংশ অংশীদারকে কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে এবং ১ হাজার ৭১৪টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে ৭৭ হাজার ১৬৩ জন এইচআইভি আক্রান্ত শিশু পিইপিএফএআর-সমর্থিত চিকিৎসার বাইরে চলে গেছে। আশার খবর হচ্ছে বিজ্ঞানীরা নতুন প্রজন্মের ওষুধ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী অগ্রগতির তথ্য দিচ্ছেন।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা তথ্যমতে, বছরে মাত্র দুইবার ইনজেকশনযোগ্য লেনাক্যাপাভির এইচআইভি প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইসলাট্রাভির ও লেনাক্যাপাভিরের সমন্বয়ে তৈরি ট্যাবলেট সপ্তাহে একবার খেয়ে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সফল ফলাফল পাওয়া গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেলে এটিই হবে বিশ্বের প্রথম সপ্তাহে একবার মুখে খাওয়ার এইচআইভি চিকিৎসা পদ্ধতি।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে আজ রবিবার ২৬তম আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলনের আগে আন্তর্জাতিক এইডস সোসাইটি এসব গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেছে। সম্মেলনেও এটা তুলে ধরা হবে। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘নতুনভাবে ভাবুন, পুনর্গঠন করুন, এগিয়ে উঠুন।’ ৩১ জুলাই পর্যন্ত চলবে সম্মেলন।

আন্তর্জাতিক এইডস সোসাইটি জানায়, ২০০৩ সালে চালু হওয়া পিইপিএফএআর বিশ্বের সবচেয়ে বড় এইচআইভি সহায়তা কর্মসূচি। এর মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের জীবন রক্ষা হয়েছে এবং বহু দেশে এইচআইভি সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমেছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও কর্মসূচিটি জাতিসংঘের ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্য অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ধরে রেখেছিল। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কর্মসূচিতে অর্থায়ন ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে এইচআইবি চিকিৎসায় ব্যাপক বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে।

৪৬ দেশের জরিপে উদ্বেগজনক চিত্র : এইডস-২০২৬ এ উপস্থাপিত পিইপিএফএআর পালস স্টাডিতে ৪৬টি দেশের ১৬৬টি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৫২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের অন্তত একটি অর্থায়ন চুক্তি বাতিল হয়েছে। ৭৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত মার্কিন নীতিমালা মেনে কার্যক্রম সীমিত করতে হয়েছে। অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় ১ হাজার ৭১৪টি সেবাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০টি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় অংশীদার সংগঠনগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জরিপে আরও দেখা গেছে, ২১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান অন্তত একটি এইচআইভি চিকিৎসা কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করেছে। ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কনডম, ২৩ শতাংশ ল্যাবরেটরি সামগ্রী, ২২ শতাংশ পিআরইপি ও ২০ শতাংশ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন পুরোপুরি বাতিল হয়নি, তাদেরও অনেককে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সেবা সীমিত বা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, যাতে অবশিষ্ট অর্থায়ন অব্যাহত থাকে।

শিশুদের চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা : সম্মেলনের জন্য উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় ২০২৫ অর্থবছরের পিইপিএফএআর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,  এ বছর বিশ্বব্যাপী ৭৭ হাজার ১৬৩ জন কম শিশু পিইপিএফএআর-সমর্থিত চিকিৎসা পেয়েছে। এ ছাড়া ২১টি গুরুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে মাত্র একটি দেশ ছাড়া বাকি সব দেশেই চিকিৎসা পাওয়া শিশুর সংখ্যা কমেছে। সবচেয়ে বড় পতন ঘটেছে দক্ষিণ আফ্রিকায়, যেখানে ৩০ হাজার ৮৮০ জন কম শিশু চিকিৎসা সহায়তা পেয়েছে।

গবেষকদের মতে, উগান্ডা, হাইতি, জাম্বিয়া, কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতি অতীতের প্রবণতা থেকে স্পষ্ট বিচ্যুতি নির্দেশ করছে। এসব দেশে জরুরি তদন্ত এবং নিয়মিত বয়সভিত্তিক তথ্য প্রকাশ পুনরায় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

বছরে দুইবার ইনজেকশনেই কার্যকর সুরক্ষা : সম্মেলনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ফলাফল পারপাস-১ ও পারপাস-২ ট্রায়াল। এই গবেষণায় ব্যবহৃত লেনাক্যাপাভির বছরে মাত্র দুইবার ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও উগান্ডায় পরিচালিত পারপাস-১ গবেষণায় ওপেন-লেবেল পর্যায়ের প্রথম ৫২ সপ্তাহে লেনাক্যাপাভির গ্রহণকারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একজনও নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হননি। অংশগ্রহণকারীদের ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ এই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ইনজেকশন নেওয়ার হার ছিল ৯৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, পারপাস-২ গবেষণায় আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, মেক্সিকো, পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সিসজেন্ডার পুরুষ ও জেন্ডার-বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী অংশ নেয়। ৫ হাজার ২৯৫ ব্যক্তিকে বছরের বেশি পর্যবেক্ষণে মাত্র চারটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়। গবেষকদের মতে, লেনাক্যাপাভির নিরাপদ ও অত্যন্ত কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পিআরইপি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ এখনো এই ওষুধের জেনেরিক লাইসেন্সের বাইরে। ফলে সাশ্রয়ীমূল্য নিশ্চিত না হলে এর সুফল অনেক দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।

মুখে খাওয়ার ওষুধে নতুন সম্ভাবনা : সম্মেলনে প্রথমবার বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে আইএসএলইএনডি-১ ও আইএসএলইএনডি- ২ ফেজ-৩ ট্রায়ালের ফলাফল। এই গবেষণায় ইসলাট্রাভির ও লেনাক্যাপাভির সমন্বয়ে তৈরি সপ্তাহে একবার খাওয়ার ট্যাবলেট পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ওষুধটি কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও সহনশীলতার দিক থেকে প্রতিদিনের প্রচলিত চিকিৎসার সমান কার্যকর। বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষকে প্রতিদিন ওষুধ খেতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে একবারের ট্যাবলেট চালু হলে রোগীদের চিকিৎসা মেনে চলার হার বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা আরও সহজ হবে।

মেরুদ-েও থাকতে পারে এইচআইভির প্রভাব : আরেকটি গবেষণায় দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৯ জন জন্মগতভাবে এইচআইভি আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীকে ১৬ বছর ধরে অনুসরণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে ভাইরাস সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ১৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মেরুদণ্ডের তরলে এখনো এইচআইভি-সম্পর্কিত রোগপ্রতিরোধী কার্যকলাপ বিদ্যমান। গবেষকদের মতে, শুধু রক্ত পরীক্ষা করে এইচআইভির পূর্ণ অবস্থা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের এইচআইভি নিরাময় গবেষণায় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থায়ন ছাড়া বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কাজে আসবে না : আন্তর্জাতিক এইডস সোসাইটির সভাপতি ও এইডস সম্মেলনের সহসভাপতি বিয়াত্রিজ গ্রিনস্টেইন বলেছেন, বিজ্ঞান দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং এইচআইভি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার আরও শক্তিশালী উপায় তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি যদি প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তা জীবন বাঁচাতে পারবে না। এজন্য স্থিতিশীল অর্থায়ন ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এইডস সম্মেলনের আগে প্রকাশিত গবেষণাগুলো বৈশ্বিক এইচআইভি কর্মসূচির সামনে একদিকে গভীর সংকট, অন্যদিকে অভূতপূর্ব সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন ওষুধ আবিষ্কার নয়; বরং সেগুলো যেন বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছেও দ্রুত, সমানভাবে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে যায়, তা নিশ্চিত করা।