সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা

দুই মাস আগে ফলোআপ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে দেশে ফেরেন সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপরই হঠাৎ করে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে থেকে তার সরে যাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। অসুস্থতা নাকি সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির কারণে এমন আকস্মিক বিদায় তা নিয়ে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির শীতল সম্পর্কের কথা সর্বমহলে আলোচিত ছিল। এমনকি জাতীয় বিদসে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠানেও রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে একসঙ্গে দেখা যায়নি। অধ্যাপক ইউনূস বিদেশ সফর শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী কখনো বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সফরের বিষয়বস্তু অবহিত করেননি। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হওয়ার পর বদলে যায় চিত্র।

জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ ভবনে মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদে থাকবেন কি না সে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে বিএনপি সরকারের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক তৈরির আবহ গোপন থাকেনি। এমনকি বিএনপি নির্বাচিত হওয়ার ১০ দিনের মধ্যে একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন ‘সপ্তাহখানেক ধরে ভালো আছি বেশ।’ সেই সাক্ষাৎকারে কঠিন সময়েও বিএনপি ও দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিলেন বলে জানান তিনি। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ২৬ মার্চ রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবকও অর্পণ করেছেন। এর আগে ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ ও ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তবে সরকারি দলের এমপিরা ছিলেন রাষ্ট্রপতির পাশে। এরপর যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ফলো-আপ চিকিৎসা শেষে গত ১৮ মে দেশে ফেরেন মো. সাহাবুদ্দিন। এর এক মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া ও চীনে ছয় দিনের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর শেষে গত ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সফর শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী বঙ্গভবনে যাননি। তখন থেকেই মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক শীতল হওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

তবে মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কথা সরকার বা বিএনপির পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন এমনটা তার মনে হয়নি। রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে এবং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমরা এটুকুই জানি এবং এই তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব।’

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে সিদ্ধান্ত হবে কে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হবেন। অন্যদিকে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, জাতীয় সংসদের আগামী সেপ্টেম্বরের নিয়মিত অধিবেশনেই বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকবেন। একইসঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

এদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সই করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করায় বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা পদটি শূন্য হলে নির্বাচন কমিশনের ভোট আয়োজনের জন্য প্রস্তুতি রাখতেই হবে। এক্ষেত্রে পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রক্রিয়া শুরু হবে। আর নির্বাচন করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানিয়েছেন, আজ রবিবার বেলা ১১টায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং জিয়ারত করবেন।

বঙ্গভবন ছেড়ে আজ গুলশানের বাসায় উঠছেন সাহাবুদ্দিন : রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার দুই দিনের মাথায় আজ রবিবার বঙ্গভবন ছাড়ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। আড়াই বছরেরও বেশি সময় দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি সপরিবারে রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবনে উঠবেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে পারেন। বঙ্গভবনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, রবিবার সকালেই প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মো. সাহাবুদ্দিন বঙ্গভবন ত্যাগ করবেন। ইতিমধ্যে তার ব্যক্তিগত মালামাল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুলশানের বাসায় নেওয়া হয়েছে। বঙ্গভবনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদায়ের আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি গতকাল রাতে বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন।

জানা গেছে, গুলশানে তার ব্যক্তিগত বাসভবন পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সরকারি টেলিফোন সংযোগসহ অন্যান্য প্রশাসনিক প্রস্তুতিও শেষ করা হয়েছে। কয়েক দিন ধরে তার ব্যক্তিগত মালামাল ধাপে ধাপে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছুদিন বিশ্রামে থাকবেন মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন।

সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গতকাল সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, জাতীয় সংসদের আগামী সেপ্টেম্বরের নিয়মিত অধিবেশনে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলার কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগের রাষ্ট্রপতির মামলা নিয়ে এখনই মন্তব্য নয়।’ কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সময়ই বলে দেবে।’

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ‘অপ্রত্যাশিত’ : দুপুরে সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির ১২ জন নেতাকে নিয়ে শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করবেন, আমারও মনে হয়নি। কিন্তু আপনারা গণমাধ্যমে যেভাবে প্রচার চালিয়েছেন, সত্যি সত্যিই সেটা ঘটল। তিনি তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে এবং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমরা এটুকুই জানি এবং এই তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব।’

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি দলের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্তের বিষয়। এ বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিছু জানেন না। সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে যেসব আলোচনা চলছে, সেগুলো সম্পর্কেও বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানে না বলেও দাবি করেন তিনি।