বাজারের ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টের বড় একটি অংশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও) পরিচালিত এক গবেষণায় পরীক্ষা করা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

রবিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করে ইএসডিও।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় ও আমদানিকৃত টুথপেস্ট সংগ্রহ করা হয়। নমুনাগুলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। একই সময়ে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর জরিপও চালানো হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে আনা দুটি নমুনার দুটিতেই, থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে এ কণা শনাক্ত হয়েছে।

প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা মিলেছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে। ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেনথল ফ্রেশে ১৬০টি করে, কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায় ১৪০টি, সিগন্যাল গ্রিন টিতে ১২০টি, পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্ট ও হিমালয়া কমপ্লিট কেয়ারে ১০০টি করে এবং সেনসোডাইন ফ্রেশ মিন্টে ৮০টি কণা পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, জেনফ্রেশ, প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো), কোদোমো অরেঞ্জ ও ক্লোজআপ রেড-হট জিঙ্ক ফ্রেশ টেকনোলজিসহ আটটি নমুনায় শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কোদোমো আলট্রা শিল্ড ফর্মুলায় সর্বোচ্চ ১৪০টি, মেরিল বেবি স্ট্রবেরিতে ৬০টি, মেরিল বেবি অরেঞ্জে ৪০টি এবং পেপসোডেন্ট কিডজ অরেঞ্জে ২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে। তবে প্যারাসুট জাস্ট ফর বেবি ও কোদোমো অরেঞ্জে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ ছিল না। ইএসডিওর মতে, এতে ভোক্তারা সচেতনভাবে পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ইএসডিওর মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সব নমুনাই সরাসরি সুপারশপ ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে নকল বা ভেজাল পণ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না।

ভোক্তা জরিপে দেখা গেছে, ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে আগে কখনও শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ বিষয়টি সম্পর্কে শুনলেও বিস্তারিত জানেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন।

জরিপ অনুযায়ী, ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করেন এবং ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করেন। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্র্যান্ড মেডিপ্লাস (৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ), এরপর ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট (১৩ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং কোলগেট (১১ দশমিক ৩ শতাংশ)।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (রসায়ন) মো. মনজুরুল করিম বলেন, কিছু উৎপাদক কম খরচে ওজন বাড়াতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করে থাকতে পারেন, যা একটি খারাপ চর্চা। তিনি জানান, টুথপেস্টের জাতীয় মানদণ্ড পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইএসডিওর দাবি, বাংলাদেশে বাজারজাত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা। সংস্থাটি বলছে, গবেষণাটি কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে লক্ষ্য করে নয়; বরং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সহায়ক বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তি তৈরির উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে।