চিম্বুক পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ঘুরে বেড়ানোর সময় কব্জি থেকে হাতঘড়িটা কখন খুলে পড়ে গিয়েছিল, বুঝতেই পারেননি নোয়াখালীর পর্যটক মো. সারোয়ার সাইফুল। শহরে হলে হয়তো ঘড়িটার আশা ছেড়েই দিতেন তিনি। কিন্তু বান্দরবানে এসে তিনি জানতে পারেন এক পাড়ার কথা। যেখানে খবর গেলেই প্রতিবেশীর কল্যাণে নাকি ‘সবই সম্ভব’! শুনলে অবাক হবেন, প্রতিবেশীরা পাহাড়ের অলিগলিতে নয় একাট্টা হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের প্লাটফর্মে। ডিজিটাল এ পাড়ার নাম হয়েছে ‘বান্দরবানবাসী’।
ঘড়ি হারানোর কথা জানিয়ে তিনি পোস্ট দেন এই গ্রুপে। ঘণ্টা কয়েকের মধ্যেই অচেনা এক সদস্য খুঁজে বের করে ফিরিয়ে দেন সেই ঘড়ি। পরে কৃতজ্ঞতায় ভরা এক পোস্টে সারোয়ার লেখেন, ‘এই গ্রুপের সকল সদস্য ও এডমিন প্যানেলদের নোয়াখালী জেলার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।’
এই একটা ঘটনা যেন বান্দরবানের এক অদৃশ্য সমান্তরাল জগতের দরজা খুলে দেয়— যেখানে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলো, শহুরে জীবনে যাদের হয়তো কখনো একে অপরের সঙ্গে দেখাই হতো না, তারা হয়ে উঠেছেন একে অপরের প্রকৃত প্রতিবেশী।
দেড় লাখেরও বেশি মানুষের এই ডিজিটাল পাড়ায় কারও দরকার জরুরি রক্ত, কারও হাতে পাওয়া অচেনা মোবাইল ফোনের প্রকৃত মালিক খুঁজতে হয়, কারও বা প্রয়োজন দুর্গম ছাত্রাবাসের জন্য একজন শিক্ষক।
একটা পোস্ট, অনেকগুলো জীবন
প্রিন্স নিদোল নামের এক সদস্য একদিন লিখেছিলেন, ‘দাদা আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার দেওয়া নাম্বার থেকে পেয়ে গেলাম ও-পজিটিভ রক্ত।’ আরেকদিন নিউ জাই খেয়াং নামের এক বাসিন্দা খেয়াং ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষক খুঁজতে পোস্ট দিয়ে এত সাড়া পেয়েছিলেন যে সবার বার্তার জবাব দিতেই পারেননি, তবু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি একবারও। সিএনজি চালক মো. এমরানের গাড়িতে একদিন পাওয়া যায় একটি ভিভো মোবাইল ফোন— মালিক খুঁজতে তিনিও ভরসা রাখেন সেই একই গ্রুপে। কোরবানির ঈদে খামারিরা এই গ্রুপে পোস্ট দিয়ে সরাসরি বিক্রি করেছেন পশু, মধ্যস্বত্বভোগীর ঝক্কি ছাড়াই সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে। এমন শত শত উদাহরণ ছড়িয়ে আছে গ্রুপের পাতায় পাতায়।
দেড় লাখ সদস্যের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক
গত ১০ বছরে ‘বান্দরবানবাসী’ গ্রুপ পরিণত হয়েছে দেড় লাখেরও বেশি সদস্যের বিশাল এক সামাজিক নেটওয়ার্কে। এই গ্রুপের আশ্চর্য একটা দিক হলো, এখানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব নিয়ে বসে আছে প্রশাসনও। জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ, সদর হাসপাতাল, পৌরসভা, সমাজসেবা বিভাগের অফিশিয়াল পাতাও যুক্ত এই গ্রুপে। কেউ একজন এলাকার বিদ্যুৎ লাইনের সমস্যার কথা জানিয়ে পোস্ট দিলে কমেন্টেই তড়িৎ ব্যবস্থার আশ্বাস দেন বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নিজে।
এই নেটওয়ার্কের প্রকৃত শক্তি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল চলতি বছরের জুলাইয়ে, যখন ভয়াবহ বন্যা কেড়ে নিচ্ছিল বান্দরবানের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সেই দুর্যোগের সময় নাগরিক সাংবাদিকরা গ্রুপে হয়ে উঠেছিলেন অসম্ভব সক্রিয়— ঘণ্টায় ঘণ্টায় জানিয়েছেন বন্যা পরিস্থিতি, রাস্তাঘাটের অবস্থা, কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে তার আপডেট। মাটি ধসে বা গাছ পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ লাইনের খবরও জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ নিজেই। শত শত পোস্টের এই স্রোতে প্রশাসন আর জনপ্রতিনিধিরাও পান তাৎক্ষণিক তথ্য, আর সাধারণ মানুষ জানতে পারেন পুরো জেলার হালচাল— একটামাত্র জায়গা থেকে।
একজন সাংবাদিকের স্বপ্ন থেকে একটি ডিজিটাল আন্দোলন
গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও এডমিন ফরিদুল আলম সুমন পেশায় সাংবাদিক। ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই ‘বান্দরবান পৌরবাসী’ নামে ছোট পরিসরে শুরু করেছিলেন এই গ্রুপ। তিনি বলেন, ‘প্রথমে বান্দরবান পৌর এলাকার বিভিন্ন নাগরিক সংকট, সম্ভাবনা ও দাবি-দাওয়া নিয়ে গ্রুপে লেখালিখি হতো। আমরা মূলত নাগরিক সাংবাদিকতাকে শক্তিশালী করতে চাইছিলাম।’ ধীরে ধীরে পরিসর বড় হওয়ায় নাম বদলে হয় ‘বান্দরবানবাসী’, যুক্ত হন স্থানীয় সাতজন তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাসেবক মডারেটর হিসেবে। সুমনের ভাষায়, ‘বিভক্তি দূর করে মানুষকে পরস্পরের কাছে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
উদ্যোক্তা থেকে রক্তদাতা— বহুমুখী এক প্ল্যাটফর্ম
শুধু জরুরি সহায়তা নয়, গ্রুপটি হয়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতিরও একটি মঞ্চ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে আয়োজিত হয় জেলার প্রথম 'অনলাইন উদ্যোক্তা মেলা'— অংশ নেন ২৫ জন উদ্যোক্তা। একই বছর ফিফা বিশ্বকাপ ঘিরে আয়োজিত হয় ‘প্রেডিকশন গেইম’, স্পন্সর হিসেবে যুক্ত হয় স্থানীয় কোচিং সেন্টার, ব্যাংক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে সাইবার নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ নিয়ে আয়োজিত হয় 'স্মার্ট নেটিজেন' কুইজ প্রতিযোগিতা, যেখানে অংশ নেন কয়েকশ প্রতিযোগী।
এডমিনের ভাষায়, 'দেশের অন্যান্য শহরে যেমন দেওয়ালে দেওয়ালে বাসা ভাড়া, মেস ভাড়া, টিউটরের বিজ্ঞাপন দেখা যায়, বান্দরবানে তা হয় না। কারণ এখানকার মানুষ শহরের দেওয়াল নোংরা না করেই এই গ্রুপে পোস্ট দিয়ে নিজেদের সব প্রয়োজন মিটিয়ে নিচ্ছেন। আর এটা দারুণভাবে কাজ করছে।'
তিন ক্লিকে রক্ত, এক মিনিটে রেজিস্ট্রেশন
চলতি বছরের জুন থেকে চালু হয়েছে 'বান্দরবানবাসী ব্লাড ডোনার ডাটাবেইজ'— একটি ওয়েব-অ্যাপ, যার মাধ্যমে জরুরি প্রয়োজনে মাত্র তিন ক্লিকে সরাসরি রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, আর রক্তদানে আগ্রহীরা মাত্র এক মিনিটেই করতে পারেন রেজিস্ট্রেশন। ফরিদুল আলম সুমন জানান, এই সেবা সহজে ব্যবহারের জন্য জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হচ্ছে কিউআর কোডও। গ্রুপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য চালু হয়েছে নিজস্ব ওয়েবসাইট বান্দরবানবাসী ডট কম।