বাবাকে এখনো খোঁজে শহীদ ফারুকের দুই সন্তান

চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজারের টাংকির পাহাড় এলাকায় ছোট দুই কক্ষের ভাড়া বাসা। ভেতরে ঢুকলেই দেওয়ালে টাঙানো একটি ছবি। সেই ছবির দিকেই প্রায় প্রতিদিন তাকিয়ে থাকে দুই শিশু ফারিয়া আক্তার ও ফাহিমুল ইসলাম। অন্য শিশুরা যখন বাবাদের হাত ধরে হাঁটে সেই দৃশ্যে চোখ ভিজে আসে ফারিয়া ও ফাহিমুলের। মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে বাবাকে স্বপ্নে দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে। দুবছর ধরে তাদের একটাই প্রশ্ন ‘বাবা কি সত্যিই আর ফিরবে না?

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকার কর্মস্থল থেকে দুপুরে বাসায় ভাত খেতে ফিরছিলেন ওমর ফারুক। তবে জুলাই আন্দোলনের ওই সময়ে গুলিতে প্রাণ হারান তিনি। একটি গুলিই থামিয়ে দেয় ১৪ বছরের ছোট্ট সংসারের সব স্বপ্ন। মর্মান্তিক সেই ঘটনার দুবছর পরেও স্ত্রী সীমা আক্তারের কাছে সময় যেন ১৬ জুলাইতেই থমকে আছে।

সীমা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে এখনো অন্য বাচ্চাদের বাবাকে দেখলে নিজেদের বাবার কথা মনে করে কাঁদে। মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে বাবাকে স্বপ্নে দেখে কেঁদে ওঠে ফারিয়া। আমি তখন কী বলব, কীভাবে বোঝাব কিছুই ভেবে উঠতে পারি না।’

সীমা আরও বলেন, ‘গুলিতে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই। কিন্তু সেখানে আগে থেকে পুলিশ ছিল। আমরা গিয়ে ফারুকের লাশ দেখতে চাইলেও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পুলিশের কাছে জানতে চাইলে তারা উত্তর দিচ্ছিল না। ফারুকের লাশ আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। পরে আমার ছোট ভাই খুঁজে বের করে। এরপর পুলিশ খুব দ্রুত পোস্টমর্টেম শেষ করে লাশ বাড়ি পাঠিয়ে দিতে চাপ দেয়।’

পরদিন ১৭ জুলাই ভোরে যখন ফারুকের মরদেহ কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, সেখানে আগে থেকেই পুলিশ উপস্থিত ছিল। কান্নাভেজা কণ্ঠে সীমা বলেন, ‘ভোর ৬টার দিকে লাশ পৌঁছানোর আগেই চান্দিনা থানা-পুলিশ সেখানে ছিল। জানাজার জন্যও ঠিকমতো সময় দেয়নি। খুব দ্রুত দাফন করতে চাপ দিতে থাকে। আমি আর আমার দুই সন্তান শেষবারের মতো মানুষটাকে ভালো করে দেখতেও পারিনি।’

কাঠমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতেন ফারুক। সন্তানদের পড়াশোনা, ভাড়া বাসা ও পরিবারের সব দায়িত্ব একাই সামলাতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সীমার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েছেন। এখন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন সীমা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে মাস শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে সংসার।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শহীদ পরিবারের জন্য ঘোষিত ৩০ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমা পেয়েছেন ২০ লাখ টাকা। ফারুকের মা-বাবা পেয়েছেন ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ব্যক্তিগতভাবে দিয়েছেন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর বাইরে সরকারের পক্ষ থেকে কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজ নেননি বলে দাবি ফারুকের পরিবারের।

সীমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে এরপর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। এনসিপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারাও আসেননি। প্রথমদিকে কিছু মানুষ এসেছিল, এরপর সবাই যেন ভুলে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শহীদ পরিবারের সদস্যদের চাকরি ও পুনর্বাসনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখন আর কোনো আশা করি না। আশা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’

জুলাই মাস এলেই সীমার কষ্ট যেন আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর জুলাই এলেই অনুষ্ঠান হয়, শহীদদের নিয়ে কথা হয়। কিন্তু কোথাও আমার স্বামীর নাম শুনি না, ছবি দেখি না। আমার স্বামী কি শহীদ ছিলেন না? আমার স্বামী কোনো দল বা সংগঠনের নেতা ছিলেন না। তিনি একজন সাধারণ খেটে খাওয়া কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। রাস্তায় চলতে গিয়ে গুলিতে শহীদ হয়েছেন। তাই হয়তো তাকে কেউ মনে রাখে না। অথচ বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার জন্য আমার স্বামীসহ যারা জীবন দিয়েছেন, আজ সেই বৈষম্যই করা হচ্ছে শহীদ ওমর ফারুকের সঙ্গে।’