সরকারি নিয়োগ নয়, আউটসোর্সিংয়েও নেওয়া হয়নি এমনকি প্রতিষ্ঠানে এই নামে কোনো পদই নেই। তারপরও ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. তোফায়েল আহমেদ দীপু। আর তাকে নিয়োগ দিয়েছেন ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন। দীপু নিজেকে ‘পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। অভিযোগ আছে, পরিচালকের কাছের মানুষ হিসেবে তার ‘দুর্নীতির সাম্রাজ্য’ দেখভাল করছেন এ দীপু।
ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, পরিচালকের দায়িত্বে নাসির উদ্দীন আসার পর থেকে লাগামহীন দুর্নীতি এবং অনিয়মে ডুবে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। টেন্ডার বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারী নিয়োগ, ওষুধ ঘাটতি, বেশি দামে নিম্নমানের অপারেশন সরঞ্জাম কেনা থেকে শুরু করে চিকিৎসক-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভয়ভীতি প্রদর্শন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দুর্নীতি ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও পরিচালকের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।
পরিচালক নাসির উদ্দীন ও তার ‘ডান হাত’ দীপুর প্রভাব থেকে হাসপাতালটিকে রক্ষা করতে চিকিৎসকরা একাধিকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন। পরিচালকের দুর্নীতি, অনিয়ম ও চাকরিবিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রতিকার চেয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন হাসপাতালের ১৫ চিকিৎসক। তবে প্রতিকার দূরের কথা, অভিযোগের কোনো তদন্তই এখনো হয়নি। উল্টো অভিযোগ করা কয়েকজনকে প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি বার্ন ইনস্টিটিউটে দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন কেনা হয়েছে। এর প্রতিটির দাম দেখানো হয় এক কোটি ৪২ লাখ টাকা। অথচ বাজার থেকে একই ব্র্যান্ড ও স্পেসিফিকেশনের মেশিন কিনতে সর্বোচ্চ ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। ওয়েবসাইটে এ মেশিনের দাম ৩০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। বার্ন ইনস্টিটিউটের এক চিকিৎসক জানান, এই দামের সঙ্গে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ অন্য খরচ যোগ করলে আরও ৩৫ লাখ লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি মেশিন কেনায় দ্বিগুণেরও বেশি খরচ দেখানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালটিতে গত অর্থবছরে টেন্ডারের অধিকাংশ পণ্যই বাজারদরের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে। কোনো কোনো পণ্য ছয়-সাতগুণ পর্যন্ত বেশি দাম দেখানো হয়েছে। দরপত্রে এমন কিছু পণ্যের চাহিদা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো পোড়া রোগীদের জন্য প্রয়োজন নেই। বার্ন ইনস্টিটিউটের দরপত্রে জায়গা পেয়েছে গাইনি বিভাগের পণ্যও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এ ধরনের কৌশল নিয়েছেন পরিচালক। এতে করে বার্নের চিকিৎসার জন্য পণ্য সরবরহকারী বিশেষায়িত অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতেই পারেনি। শেষ পর্যন্ত পরিচালকের পছন্দের প্রতিষ্ঠান দরপত্রে ‘যোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
দরপত্রের একটি নথি দেখা যায়, এরগোটামিন নামক একটি পণ্যের চাহিদা দেখানো হয়েছে ১১ হাজার পিস, আর বাটারফ্লাই নিডেলের চাহিদা এক লাখ ৬০ হাজার পিস। অথচ বার্ন ইনসস্টিটিউটের কয়েকজন চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে জানান, এরগোটামিন মূলত গাইনি বিভাগের ওষুধ। সিজারিয়ানের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে এটি ব্যবহৃত হয়। পোড়া রোগীর চিকিৎসায় এর কোনো প্রয়োজন নেই। আবার বাটারফ্লাই নিডেলের চাহিদা পাঁচ হাজারের মতো হলেও দরপত্রে এক লাখ ৬০ হাজার সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। একটি সূত্র জানায়, সাপ্তাহিক মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন চিকিৎসক আপত্তি তুললে পরিচালক তাদের থামিয়ে দেন।
পণ্য না পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধের মতো বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটেছে বার্ন ইনস্টিটিউটে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪০ কোটি টাকার মালামাল দেওয়ার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করা হয়। সেই প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে মাত্র ১৭ কোটি টাকার মালামাল সরবরাহ করে। তবে অর্থবছর শেষে টাকা ফেরত না দেওয়ার কারণ দেখিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানকে আরও ২৩ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি এরপর আরও ১০ কোটি টাকার মালামাল সরবরাহ করলেও এখনো ১৩ কোটি টাকার পণ্য পাওয়া যায়নি। এ পণ্য আদৌ হাসপাতাল পাবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, পরিচালক নিজেও জানেন তার সীমাহীন দুর্নীতি আগামীতে অডিটে ধরা পড়বে। তাই অডিট আপত্তি মেটানোর জন্য তিনি আগে থেকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আলাদা করে রেখেছেন। সেই সঙ্গে হাসপাতালটিকে তিনি কার্যত দুর্নীতির নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষেত্রে পরিচালকের ডান হাত হিসেবে কাজ করছেন তোফায়েল আহমেদ দীপু। তিনি নিজেকে ‘পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এমনকি নিজের ফেসবুকের বায়োতে পরিচালকের পিএস টু লিখে রেখেছেন। হাসপাতালে নিয়োগের পর থেকে দীপু হয়ে উঠেছেন অপ্রতিরোধ্য। টেন্ডার থেকে শুরু করে, আউটসোসিং নিয়োগসহ হাসপাতালের প্রায় সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। গাড়িচালক হিসেবে ১৯ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ পাওয়া দীপুর দাপটে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠিত এশিয়ার সবচেয়ে বড় হাসপাতালটি।
প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহযোগী অধ্যাপক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীপু বৈধ কোনো কর্মচারী নন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও নিযুক্ত নন। তিনি সরকারি বেতন-ভাতা নেন বলেও প্রমাণ নেই। আউটসোর্সিং স্টাফদের বিবরণীতে তার নিয়োগের কোনো উল্লেখ নেই। তারপরও একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সরকারি অর্থে তাকে নির্দিষ্ট ডেস্ক ও কম্পিউটার সরবরাহ করা হয়েছে। এর আগে কোনো পরিচালকের পিএস সরকারি খরচে এমন সুবিধা পাননি।’
তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৬ জুন জারি করা সরকারি প্রজ্ঞাপনে ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়োগবিধিবহির্ভূত কিছু পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএসসির বাধ্যতামূলক পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা আছে। দীপুর ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়ার কিছুই অনুসরণ করা হয়নি। ফলে তার নিয়োগটি ওই প্রজ্ঞাপন ও সরকারি চাকরির মৌলিক নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।’
অভিযোগ আছে, এনআইবিপিএসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক বৈঠকে দীপুকে নিয়মিত অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক প্রটোকল সুবিধা দেওয়া হয়। বিদেশি অতিথি, আন্তর্জাতিক চিকিৎসক এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। এ সংক্রান্ত ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। দীপুর মালিকানাধীন একটি বিলাসবহুল গাড়ির কাগজপত্র (মিতসুবিশি এক্সপানডার, গাড়ি নম্বর-ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৬-৭৪১৪) হাতে পেয়েছে দেশ রূপান্তর। প্রশ্ন উঠেছে মাত্র ১৯ হাজার টাকা বেতনের একজন কর্মচারী এত দামি গাড়ি কীভাবে ব্যবহার করছেন।
বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালকের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৭ আগস্ট তখনকার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে প্রতিষ্ঠানের ১৫ চিকিৎসক লিখিত অভিযোগ করেন। এতে বলা হয়, আউটসোর্সিংয়ের নামে ড্রাইভার পদে নিয়োগ পাওয়া দুজন ব্যক্তি আসলে পরিচালকের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে একজন দীপু। তারা হাসপাতালের নিয়োগ, কেনাকাটা ও কর্মচারী নিয়ন্ত্রণসহ সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করেন। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরিচালকের হস্তক্ষেপের কারণে আরএফকিউ, সরাসরি ক্রয়, অনুদানের অর্থে ক্রয়সহ প্রায় সব ধরনের ক্রয় প্রক্রিয়াই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এর আগে ই-জিপি সিস্টেমেও তার নিয়মবহির্ভূত হস্তক্ষেপের কারণে ক্রয়সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটি থেকে অনেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে হাসপাতালের ৩৭৩ নম্বর কক্ষটি পরিচালক ব্যক্তিগত স্মোকিং রুম হিসেবে ব্যবহার করছেন। অতিসম্প্রতি অবশ্য তিনি ধূমপানের জন্য কক্ষটি ব্যবহার করছেন না।
বার্ন ইনস্টিটিউটের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির সময় অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে কে কী দিয়েছেন আর তা কীভাবে কোথায় ব্যবহার হয়েছে তার কোনো হিসাব রাখা হয়নি। এ হিসাব শুধু পরিচালক জানেন। এমনকি একটি ব্যাংক থেকে বিনামূল্যে পাওয়া কোটি টাকার ওষুধও ক্রয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জানা গেছে, ডা. নাসির উদ্দীন ২০২৪ সালের শেষ দিকে একটি কোম্পানির টাকায় যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বার্নের একটি কনফারেন্সে যান। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। তার বিমান ভাড়া, রেজিস্ট্রেশন ফি, পাঁচতারকা হোটেলে থাকাসহ যাবতীয় খরচ বহন করে ওই কোম্পানি। এ কোম্পানির আমদানি করা ফ্লামিনাল নামক একটি জেল/অয়েন্টমেন্ট পোড়া ও ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে গরম ও আর্দ্রতার কারণে ভালো ফলও পাওয়া যায় না। বার্ন ইনস্টিটিউটের কয়েকজন চিকিৎসকের অভিযোগ, এ ওষুধটি মাইলস্টোন দুর্ঘটনার সময় দগ্ধদের চিকিৎসায় ব্যবহার করতে চিকিৎসকদের বাধ্য করেন ডা. নাসির উদ্দীন। পরে তিনি টেন্ডারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ এ ওষুধ কেনেন। লিভিসিকা নামে ত্বকের দাগ দূর করার একটি অয়েনমেন্টের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ডা. নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে অনিয়মের আরও একটি লিখিত অভিযোগ সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ কর্মচারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া এ অভিযোগে অবিলম্বে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানানো হয়। তবে সেই অভিযোগেরও কোনো সুরাহা হয়নি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর এলাকার বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে পরিচালক নাসির উদ্দীন দোর্দণ্ড প্রতাপ খাটিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে দাবি করতেন, আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেখিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারীর প্রভাব।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পান নাসির উদ্দীন। এর পরপরই তিনি বিএনপিপন্থি চিকিৎসক সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সদস্যপদ গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন এমন দাবিও করতে শুরু করেন। এর আট মাসের মাথায় গত বছরের অক্টোবরে বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক হন নাসির উদ্দীন। বার্ন ইনস্টিটিউটে আসার আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে একটানা তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মাত্র ১১ মাসের জন্য একবার ফরিদপুরে বদলি হলেও বাকি সময়ের পুরোটা ঢাকার দুটি সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেছেন নাসির উদ্দীন। সূত্র জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালের মেয়ের প্রাইভেট টিউটর হওয়ার সুবাদে তিনি এমন রাজকপাল অর্জনে সক্ষম হন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং ‘স্বাচিপ’ ঘনিষ্ঠ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবিরের সঙ্গে এএমজেড হাসপাতালে তার শেয়ার রয়েছে। এ সংক্রান্ত নথি পেয়েছে দেশ রূপান্তর। সরকারি চাকরিতে থেকে বেসরকারি কোনো হাসপাতালে শেয়ার থাকা বিধিপরিপন্থি হলেও কোনো সমস্যায় পড়েননি নাসির উদ্দীন।
অভিযোগ নিয়ে যা বলছেন ডা. নাসির উদ্দীন : টেন্ডারে অনিয়ম এবং বেশি দামে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন কেনার বিষয় পরিষ্কার কোনো জবাব দেননি ডা. নাসির উদ্দীন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে ভালো মানের মেশিন কিনেছি। কোম্পানি কতটুকু লাভ করবে বা করবে না, তা তো আমরা ঠিক করে দিতে পারি না। অন্যরা যদি এ মেশিন আরও কম টাকায় কিনে থাকে, তখন আমরা এটা নিয়ে কথা বলতে পারি।’
টেন্ডারে প্রয়োজনের বাইরে পণ্য কেনার অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, ‘চাহিদার ভিত্তিতেই সব কিছু কেনা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা হয় না।’ পণ্য সরবরাহের আগেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু মালামাল বিদেশে থাকে। জুনের মধ্যে আমাদের সব শেষ করতে হয়। তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে বিল দেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে বা বিভিন্ন সোর্স থেকে যে মালামাল আছে তা অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে আসে না। ফলে মুচলেকা নিয়ে নিয়েছি। প্রায় সব মালামাল চলে এসেছে। অল্প কিছু বাকি আছে। আমাদের টার্গেট থাকে সেপ্টেম্বর। কারণ অডিটগুলো সেপ্টেম্বরে হয়ে থাকে।’
তোফায়েল আহমেদ দীপুর নিয়োগ এবং হাসপাতালে তার প্রতাপ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে পরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে লোকাল নিয়োগ। শুধু কাজ করার জন্য। আমাদের কাজের সুবিধার জন্য। বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের কাছে যে ফোন আসে, সেগুলো সে রিসিভ করে। অথবা একটা রোগী এলে বললাম হেল্প করতে, সেগুলো করে।’
পরিচালকের পিএস হিসেবে দীপু পরিচয় দিতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ রকম যদি থেকে থাকে ওইটা আমি... আমার জানা নেই।’ দীপুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্যি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
অন্যদিকে তোফায়েল আহমেদ দীপুর দাবি, তিনি যা কিছু করেছেন সবই হাসপাতালের স্বার্থে। ঘনিষ্ঠতার কারণে পরিচালক তাকে ‘জোর করে’ বার্ন ইনস্টিটিউটে চাকরি দিয়েছেন। দুর্নীতি-অনিয়মের জড়িত থাকার অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমি যা কিছু করি হাসপাতালের স্বার্থে করেছি। পরিচালক আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো জানেন। তার সঙ্গে আমার পরিবারিক সম্পর্ক। সে জন্য তিনি একপ্রকার জোর করে আমাকে চাকরি দিয়েছেন। এখানে পদ কোনো বড় কথা নয়। হাসপাতালের ভালো করতে গিয়ে ফেঁসে গেছি। এ চাকরিই আমি করব না।’
বিলাসবহুল গাড়ি কেনার বিষয়ে প্রশ্ন করলে দাবি করে দীপু বলেন, পারিবারিকভাবে তিনি আর্থিকভাবে অনেক সচ্ছল। এলাকায় তাদের পরিবারের সচ্ছলতা সম্পর্কে সবার জানা আছে। এ ধরনের গাড়ি কেনার জন্য তাকে চাকরির অর্থের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালকের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগগুলোকে গুরুতর হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্যবিদ রাশেদ রাব্বি। দরপত্রের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা বড় ধরনের দুর্নীতি। আপনি যা কিনবেন না, তা দরপত্রে দিতে পারবেন না। মূলত নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য স্পেসিফিকেশনে এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়।’