হরমুজের যুদ্ধকৌশল লোহিত সাগরে প্রয়োগ করতে চায় হুথিরা: ইয়েমেন

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইরানের হরমুজ প্রণালির কৌশল অনুসরণ করতে চায় বলে অভিযোগ করেছেন  ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরাহ আল-জৌবা। সূত্র আল-জাজিরা। 

সোমবার (২৭ জুলাই) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইয়েমেন দূতাবাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, 'হুথিরা ইরানের মডেল অনুসরণ করতে চায়। এতে উপসাগর ও লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রণালিই কার্যত অচল হয়ে যেতে পারে।'

আল-জৌবার দাবি, ইরান-সমর্থিত হুথিদের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথেষ্ট কঠোর প্রতিক্রিয়া না থাকায় তারা আরও উৎসাহিত হয়েছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। হরমুজ প্রণালির মতোই এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন এবং মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়।

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, বাব আল-মান্দেব হয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকবে। লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। রবিবার এই পথ দিয়ে মাত্র ১১টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে।

চলতি জুলাই মাসের শুরুতে হুথিরা সৌদি আরবগামী ও সৌদি আরব থেকে আসা জাহাজ চলাচলের ওপর ;'সামুদ্রিক অবরোধ' ঘোষণা করে এবং দেশটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

এর জবাবে সৌদি আরব হুথি-নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হোদাইদায় বিমান হামলা চালায়।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর এটিই সবচেয়ে বড় উত্তেজনা। একই সময়ে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলাও আবার জোরদার হয়েছে।

আল-জৌবা বলেন, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমানে হুথি-নিয়ন্ত্রিত ও সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমান্তে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলছে, তবে এখনো বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযান শুরু হয়নি।

চলতি মাসের শুরুতে হোদাইদার আশপাশে হুথি ও সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে উভয় পক্ষের প্রায় ২০ যোদ্ধা নিহত হন।

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে সময়ের প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদি শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।

২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আরব জোট হুথিদের ক্ষমতাচ্যুত করতে সামরিক অভিযান শুরু করে, যা ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

২০২৬ সালেও হুথিরা রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এদিকে, ইয়েমেনে দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে বলে সৌদি আরবের অভিযোগ। এ নিয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে টানাপোড়েনও দেশটির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দীর্ঘ এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ ইয়েমেনিরা। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সালের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ হামলায় নয়; বরং দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধি ও অন্যান্য মানবিক সংকটের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।