ভরা মৌসুম চললেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুরের নদ-নদী ও বাজারে মিলছে না প্রত্যাশিত ইলিশ। ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক ও দেশীয় মাছ। ফলে বাজারে মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে।
পিরোজপুরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট ইলিশ প্রতি কেজি ১,২০০ থেকে ২,০০০ টাকা এবং মাঝারি ও বড় আকারের ইলিশ ২,২০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের দামও চড়া। রূপচাঁদা প্রতি কেজি ১২০০ টাকা, তপস্বী ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা, পোয়া ৬০০ টাকা এবং টুনা মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চাষের মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাগরে অবৈধ ট্রলিং ফিশিং জাহাজের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ আহরণ এবং মাছের রেণু নষ্ট হওয়ার কারণে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধ চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে পোনা ও ছোট মাছ নিধন হওয়ায় দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে এবং বাজারে চাষের মাছের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
তাদের দাবি, সাগরে ট্রলিং ফিশিং জাহাজের কারণে মাছের রেণু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে না।
ক্রেতাদের অভিযোগ, ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ খুবই কম। দেশীয় মাছও আগের মতো পাওয়া যায় না। ফলে মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
পিরোজপুরের কাউখালী বাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী হেলাল বলেন, ইলিশের এখন ভরা মৌসুম, কিন্তু বাজারে তেমন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। অল্প যা কিছু পাওয়া যায় তাও বেশি দামে কিনতে হয়, আর জন্যই বাজারে ইলিশ মাছের দাম কিছুটা বেশি।
পিরোজপুর পৌর মাছ বাজারের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, আগে বর্ষাকালে দেশীয় অনেক মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু এখন আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। অবৈধ চায়না জাল ও সাগরে ট্রলিং জাহাজের কারণেও মাছের রেণু নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
মাছ কিনতে আসা রনি আলী বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে ইলিশ কেনা সম্ভব নয়। বাজারে মাছের সরবরাহ কম, আর যা পাওয়া যায় তার দাম দুই হাজার টাকার বেশি। ইলিশ এখন বড়লোকের খাবার, গরিবের জন্য বিলাসিতা।
পিরোজপুর জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি কমল দাস বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সাগরে ট্রলিং জাহাজ দিয়ে মাছ ধরার কারণে জেলেরা কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ট্রলিং জাহাজ দ্বারা রেনু পোনা নষ্ট করা হয়। এতে মাছের প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
তবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত বলেন, ইলিশ একটি সামুদ্রিক মাছ। প্রজনন মৌসুমে ডিম ছাড়তে তারা সাগর থেকে নদীতে আসে। বর্তমানে নদ-নদীতে অনেক ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় সমুদ্র থেকে নদীতে ইলিশের প্রবেশে বাধা তৈরি হচ্ছে। এ কারণেই নদীতে ইলিশ তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। এছাড়া পিরোজপুরে ধরা পড়া ইলিশের বড় অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ফলে স্থানীয় বাজারে ইলিশের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকে। পাশাপাশি চায়না দুয়ারি জাল সহ অবৈধ জালের কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা মৎস্য বিভাগ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব জাল জব্দ ও ধ্বংস করছে। দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।