সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে কর্মচারীদের আয়, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিকেও গুরুত্ব দিয়ে বেতন ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হয়েছিল ৮৫ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। নবম পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে পেনশনের পাওনাসহ এই খাতে রাষ্ট্রের মোট খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধিদল চলমান আর্থিক সংকটের মধ্যে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিরোধিতা করেছে। আর্থিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ। সংস্থাটি মনে করে অর্থের সংস্থানের উৎস ঠিক না করে এই বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সংকট আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি চাপ আরও বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
তবুও এরই মধ্যে পে-স্কেলের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বর্তমানে সব গ্রেডে প্রায় একই হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি দেওয়ার পদ্ধতি থেকে সরে আসছে সরকার। নতুন কাঠামোতে তুলনামূলকভাবে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পাবেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নবম পে-স্কেলে কেমন হবে মূল বেতন?
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিকভাবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও বর্তমানে দুই ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নতুন পে-স্কেল কার্যকরের পর যেন কোনো আইনি বা কারিগরি জটিলতা তৈরি না হয়, সেজন্য খসড়া প্রজ্ঞাপনের আইনি যাচাই, বিধিমালা সংশোধন এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত হালনাগাদের কাজও এগিয়ে চলছে।
জানা গেছে, বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডেই গড়ে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। তবে নতুন খসড়া অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পঞ্চম গ্রেডে ৪ শতাংশ, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে।
বেতন বৃদ্ধির এ নতুন নীতিমালার পেছনে সরকারের পরিচালিত একটি বিস্তৃত জরিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জরিপে অংশ নেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
জরিপে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বর্তমান ইনক্রিমেন্ট পদ্ধতির পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির হার সমন্বয়ের পক্ষে মত দেন। এ ছাড়া ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে ভিত্তি করে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দেন।
নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় এ ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা এবং ছয় সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা।