রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে তোলা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যায়, হাজারো শিশুর ভিড়ে স্কুলড্রেস পরা এক কিশোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তটি স্পর্শ করে অনেককে।
কিশোরটির নাম তাহসিন আব্দুল্লাহ। তবে সেই হাসির পেছনে রয়েছে এক গভীর বেদনার গল্প।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় তাহসিন তার বড় বোন তাসনিয়াকে হারায়। একই স্কুলে পড়লেও সেদিন তারা ছিল আলাদা ভবনে। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং তাসনিয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। দুর্ঘটনায় তাসনিয়াদের ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিকট শব্দ শুনে বোনকে খুঁজতে ছুটে যায় তাহসিন। কারও কাছ থেকে শুনেছিল আহতদের জন্য স্যালাইন ও পানির প্রয়োজন। তাই ছোট দুই হাতে স্যালাইন ও পানির বোতল নিয়ে অপেক্ষা করেছিল সে। কিন্তু আর ফিরে আসেনি তার প্রিয় বোন।
পরিবার জানায়, দুর্ঘটনার পর থেকে অনেকটাই বদলে যায় তাহসিন। এক হিলিং সেশনে সে লিখেছিল, ‘আমার কষ্ট অনেক। আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি। সে মারা গেছে। ওকে আমি অনেক অনেক মিস করি। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’
বোনকে হারানোর পর তার মুখে আগের মতো হাসি দেখা যেত না। তবে ২৭ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মাঠ প্রদক্ষিণের সময় কাছে আসতেই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে তাহসিন। সেই মুহূর্তের ছবিই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবিটি দেখার পর প্রধানমন্ত্রী জানতে পারেন, হাসিমাখা সেই শিশুটির জীবনে রয়েছে এমন এক মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা। এরপর তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজ নিতে নির্দেশ দেন।
এর ধারাবাহিকতায় বুধবার (২৯ জুলাই) বাবা নাজমুল হককে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে তাহসিন। বর্তমানে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারের আরেক সদস্য তার ছোট বোন, যে নার্সারিতে পড়ে।
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়। পাশাপাশি এমন কিছু করতে চায়, যা মানুষের উপকারে আসবে এবং মানুষকে আকৃষ্ট করবে।
প্রধানমন্ত্রী তার স্বপ্নের প্রশংসা করেন। তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা, নিয়মিত খেলাধুলা এবং লক্ষ্য অর্জনে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন।
আলাপচারিতায় তাহসিন জানায়, তার শখ ফুটবল খেলা। প্রধানমন্ত্রী তাকে নিজের স্বাক্ষর করা একটি বাস্কেটবল ও একটি ড্রোনসেট উপহার দেন।
সাক্ষাৎ শেষে তাহসিন জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পেরে সে খুব আনন্দিত। এমন সুযোগ পাবে, তা সে ভাবেনি। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের এই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে মুখিয়ে আছে বলেও জানায় সে।
তাহসিনের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে পরিবারের একজনের মতো কথা বলেছেন। তাই তার কোনো অস্বস্তি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখার সুযোগও হয় তার। সেখানে রাখা গাড়ি ও জাহাজের রেপ্লিকা তার ভালো লেগেছে। বাবার মোবাইল ফোনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফিও তোলে সে।
এ সময় মাইলস্টোনের যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো তাহসিনের বাবার প্রতি গভীর সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী, সহযোগী অধ্যাপক (অর্থোপেডিক) ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, উপ প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যসচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন উপস্থিত ছিলেন।