সভ্য সমাজে টেঁটার অসভ্যতা!

রাজবাড়ীর পাংশার দড়িবাংলা গ্রামে জমির সীমানা প্রাচীর নিয়ে বিরোধ চলছিল আক্তার মন্ডল ও হাকিম মন্ডলের মধ্যে। এ নিয়ে গত ২১ জুন মীমাংসা বৈঠকেই দুই পক্ষ জড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষে। একে অপরকে ঘায়েল করতে টেঁটা নিয়ে হামলে পড়ে। শতাধিক বাড়িতে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। প্রায় একই ঘটনা জুনের শেষ সপ্তাহে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের সূর্যকান্দি এলাকায়ও ঘটে। মাছ ধরা নিয়ে দুপক্ষের টেঁটাযুদ্ধে শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হন।

দেশের অন্তত ১০টি জেলায় এভাবে টেঁটাযুদ্ধের ঘটনা নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। একসময় এসব এলাকা শান্তির জনপদ বলে পরিচিত থাকলেও এখন সেখানে টেঁটার থাবা পড়েছে। টেঁটা-বল্লম নিয়ে হামলে পড়ছে একপক্ষ আরেক পক্ষের ওপর। মানবসভ্যতা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখছে, তখন বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে এখনো মধ্যযুগীয় আদিম অস্ত্র শাসন করছে সাধারণ মানুষের জীবন ও ভাগ্য। লোহার ফলা আর বাঁশের হাতলে তৈরি মারণাস্ত্রটি টেঁটা হিসেবে পরিচিত। দেশের বেশ কিছু জনপদে, বিশেষ করে চরাঞ্চল এবং নদীবিধৌত জেলাগুলোতে টেঁটা কেবল মাছ ধরার সরঞ্জাম নয়, বরং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের প্রধান হাতিয়ার। জমি দখল, আধিপত্য বিস্তার, বংশগত বিরোধসহ বিভিন্ন ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ টেঁটা হাতে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে গেলেও পিছু হটতে হয়। এমনকি টেঁটায় আহত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরাও। ফলে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়ছে পুলিশ। সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় সরেজমিনে জানা গেছে এসব তথ্য। পুলিশ কর্তারা বলছেন, অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়েও তারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। তারপরও ওই সব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত তিন বছরে ৫ হাজারের বেশি টেঁটাযুদ্ধ হয়েছে। এতে প্রাণ গেছে শতাধিক। অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে জনপদ।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, টেঁটাযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত প্রস্তুতি এবং বিশেষ প্রশিক্ষণ। টেঁটাযুদ্ধ বন্ধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিকভাবে লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। ওই সব জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি ও নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।

চিকিৎসকদের মতে, টেঁটাবিদ্ধ আহতকে অস্ত্রোপচার ছাড়া সুস্থ করা অসম্ভব। অনেক সময় টেঁটা বের করতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই বা হাসপাতালে নেওয়ার পথে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়।

গোপনে তৈরি হচ্ছে টেঁটা : টেঁটা দেখতে অত্যন্ত সাধারণ মনে হলেও আঘাত প্রচণ্ড মারাত্মক। কারও শরীরে বিঁধলে তা বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। মূলত কামারশালাগুলোতে গোপনে তৈরি হচ্ছে এই মারণাস্ত্র। একটি লম্বা বাঁশ বা কাঠের লাঠির মাথায় লোহার এক বা একাধিক সুচালো ফলা যুক্ত করে টেঁটা তৈরি করা হয়। এর কয়েকটি সাধারণ প্রকারভেদ আছে। একটি হাতলে পাঁচ থেকে ৯টি বা তারও বেশি ফলা ছাতার মতো বা সারিবদ্ধভাবে যুক্ত থাকে। এই টেঁটাগুলোর ফলার মাথায় মাছ ধরার বড়শির মতো উল্টা বাঁক বা ‘আঁকশি’ থাকে। এটি যখন কারও শরীরে ঢোকে, তখন টেনে বের করতে গেলে ভেতরের মাংসপেশি ও নাড়িভুঁড়ি ছিড়ে চলে আসে।

বিশেষ প্রশিক্ষণে টেঁটাযুদ্ধ : অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরাঞ্চলের কিছু নির্দিষ্ট পরিবার বা গোষ্ঠীর যুবকদের ছোটবেলা থেকেই টেঁটা নিক্ষেপের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নদী বা জলাশয়ে চলন্ত মাছ শিকারের মাধ্যমেই মূলত এই প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি হয়। পরবর্তী সময়ে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার জন্য তারা বিভিন্ন বস্তুর ওপর নিশানা অনুশীলন করে। কীভাবে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে টেঁটা ছুড়তে হয়, কীভাবে প্রতিপক্ষের ছুড়ে দেওয়া টেঁটা ঢাল দিয়ে ঠেকাতে হয় তারও রয়েছে বিশেষ কৌশল। নরসিংদীর পলাশ এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন ও প্রশান্ত বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, শত্রুর মোকাবিলার জন্য এলাকায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বয়স্ক ও বড় ভাইয়েরা টেঁটা ব্যবহারের পরামর্শ দেন। টেঁটা নিক্ষেপের সময় প্রথমে প্রতিপক্ষের হাঁটুর নিচে মারতে হয়। তাতেও কাজ না হলে এলোপাতাড়ি মারা হয়। যেভাবেই হোক শত্রুকে মোকাবিলা করতেই হয়।

ভাড়াটে টেঁটাবাহিনী : পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, চরাঞ্চলে এখন পেশাদার ‘টেঁটাবাহিনী’ গড়ে উঠেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা আধিপত্য বজায় রাখতে বা প্রতিপক্ষের জমি দখল করতে এই বাহিনীকে ভাড়া করেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কাজে ভাড়ায় অংশ নিলে ৫ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। বিশেষ করে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফরিদপুর অঞ্চলে ভাড়ায় খাটার প্রবণতা বেশি। এর পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা এবং নারায়ণগঞ্জেও কয়েক বছর ধরে ছড়িয়ে পড়ছে টেঁটাযুদ্ধ। সব মিলিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে ১০ জেলা।

আধুনিক অস্ত্রের যুগেও দাপট : ডিজিটাল নিরাপত্তা, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের এই যুগেও টেঁটার দাপট কমছে না। এর কারণ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে গুলির খোসা বা ফরেনসিক রিপোর্টে সহজেই অপরাধী শনাক্ত করা যাচ্ছে। কিন্তু টেঁটাযুদ্ধের ক্ষেত্রে সেটি সম্ভব নয়। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুলিশকে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। অনেক ঘটনায় পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং তারা রীতিমতো খেই হারিয়ে ফেলছে। দুই পক্ষের হাজার হাজার মানুষ টেঁটাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে মাত্র ১৫-২০ জনের একটি পুলিশ দল অসহায় হয়ে পড়ে। ফাঁকা গুলি বা টিয়ার শেল ছুড়েও উন্মাদের মতো ছুটে আসা জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব হয় না বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে মানুষ পুলিশের কাছে মুখ খুলতে চায় না। ফলে কারা টেঁটাযুদ্ধের ইন্ধনদাতা, তাদের খুঁজে বের করতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক সময় আসামি গ্রেপ্তার করতে গেলে নারীদের ঢাল বানিয়ে পুরুষরা পেছন থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে টেঁটা ছুড়তে থাকে।

আধিপত্য নিয়ে রণক্ষেত্র : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের জ. ই. বুলবুল জানান, জেলার জনপদগুলোতে ‘টেঁটাযুদ্ধ’ গোষ্ঠীগত এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ব্যাধি। নবীনগর সরাইল, নাসিরনগর ও আশুগঞ্জ উপজেলার গ্রামগুলোতে আধিপত্য নিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনা বেশি ঘটছে। গ্রামীণ গোষ্ঠীপ্রধানদের আধিপত্য এবং ভূমি ও জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে। গত দুই বছরে ১৪৩৭টি বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তুচ্ছ ঘটনায় ক্ষণিকের মধ্যে কয়েক শ মানুষ টেঁটাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রণক্ষেত্র তৈরি করে। নবীনগর থানার ওসি মোরশেদুল আলম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক সময় পুলিশকে নীরব দর্শক হয়ে যেতে হয়, কিছুই করার থাকে না। প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও ধর্মীয় নেতারা সমন্বিতভাবে কাজ করলে টেঁটাযুদ্ধ শেষ হতে পারে।’

ভয়ংকর হয়ে উঠছে নরসিংদীর চরাঞ্চল : নরসিংদী থেকে সুজন বর্মণ জানান, মেঘনা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরগুলো একসময় ছিল কৃষি আর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের উৎস। কিন্তু নরসিংদীর রায়পুরা ও সদর উপজেলার কয়েকটি চর এখন পরিচিত ‘টেঁটাযদ্ধের’ জন্য। আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, রাজনৈতিক কিংবা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের সংঘর্ষে মানুষ রক্তাক্ত হচ্ছে। একসময়ের শান্তিপূর্ণ জনপদে এখন শুধু আতঙ্ক। রায়পুরার নিলক্ষা, বাঁশগাড়ী, মির্জারচর ও পাড়াতলী এবং নরসিংদী সদর উপজেলার আলোকবালি, চরদিঘলদীসহ কয়েকটি ইউনিয়ন টেঁটাযুদ্ধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। গত সাত বছরে এসব এলাকায় সংঘর্ষে অন্তত অর্ধশত মানুষ মারা গেছেন। অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর নরসিংদী জেলা সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, ‘চরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক বিভাজনের কারণে এই সহিংসতা টিকে আছে। কোনো একটি ঘটনার বিচার দ্রুত শেষ না হলে প্রতিশোধের মানসিকতা তৈরি হয়, যা পরবর্তী সংঘর্ষের ভিত্তি গড়ে দেয়। শিক্ষার প্রসার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর স্থানীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এই সহিংসতার চক্র ভাঙা সম্ভব।’

রায়পুরা থানার ওসি মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চরাঞ্চলে আধিপত্য ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করেও টেটাঁসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এটা দীর্ঘদিনের সমস্যা। সামাজিকভাবে গোষ্ঠীগুলোর প্রধানের সঙ্গে বসে দ্বন্দ্বগুলো নিরসনে কাজ করছি।’

তুচ্ছ ঘটনা রূপ নেয় সংঘর্ষে : রাজবাড়ী থেকে আব্দুল হালিম জানান, তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে প্রায়ই ঘটছে টেঁটাযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। রাজবাড়ী লেখক-পাঠক কেন্দ্রের সভাপতি কবি নেহাল আহম্মেদ বলেন, সংঘাতের পেছনে থাকে গুজব, রাজনৈতিক মেরুকরণ, উসকানিমূলক অপপ্রচার। রাজবাড়ী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে ধৈর্যশক্তি কমে গেছে। মানুষের প্রতি মানুষের সম্মানবোধও অনেক কমে গেছে। এ কারণে অনেক সময় তুচ্ছ কোনো ঘটনাও অনেক বড় আকারে রূপ নেয়।’

নারী-শিশুরাও জড়িয়ে পড়ে : ফরিদপুর থেকে সুজাউজ্জামান জুয়েল জানান, ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা এবং ভাঙ্গা উপজেলা এখন মারামারি ও সংঘর্ষপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মোড়ল ও মাতব্বররা আধিপত্য ধরে রাখতে নারী-শিশুদেরও দলে ভেড়ান। কোনো ঘটনা ঘটলেই নারী-শিশুরাও নেমে পড়ে টেঁটাযুদ্ধে।