‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রতিশ্রুতিতে সরকারকে অভিনন্দন

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা—যাকে আন্তর্জাতিকভাবে এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোডক্র্যাশ বলা হয়। দীর্ঘদিন ধরে রোডক্র্যাশ একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, শত শত মানুষ আহত হয়ে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। প্রতিটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতিই নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামোর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এমন বাস্তবতায় সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষণা দিয়েছেন যে, ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ এবং আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার আলোকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ চূড়ান্ত করে অনুমোদন ও প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সরকারের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসার দাবিদার। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞ, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইনের দাবি জানিয়ে আসছিল। সেই দাবির সঙ্গে সরকারের এই প্রতিশ্রুতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

তবে অভিনন্দনের পাশাপাশি একটি প্রত্যাশাও রয়েছে—এই প্রতিশ্রুতি যেন ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আইনটি প্রণয়ন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হোক। কারণ, মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন মানুষ রোডক্র্যাশে প্রাণ হারান। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৭ জন এবং প্রতি ঘণ্টায় ৩ থেকে ৪ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বছরে ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু মানে প্রতি মাসে প্রায় ২,৬৩২ জন এবং প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৬০৭ জন মানুষের প্রাণহানি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, সড়ক নিরাপত্তা এখন আর শুধু পরিবহন খাতের বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় জরুরি ইস্যু।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত বড়। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, রোডক্র্যাশের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিবছর তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ হারায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি বছরে কয়েক লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়। চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস, দক্ষ জনশক্তি হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যয় জাতীয় উন্নয়নকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাত্র ১৩ দিনে ২৮১ জন নিহত এবং ৮৩৭ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে দেখা যায়, ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ৩৯৪টি রোডক্র্যাশে ৪০২ জন নিহত এবং ১,২৯৪ জন আহত হয়েছেন। এসব তথ্য প্রমাণ করে, উৎসবকালীন যাত্রায়ও আমাদের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট দুর্বল।

রোডক্র্যাশের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ক্লান্ত বা মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ। তবে এসব সমস্যার মূলেও রয়েছে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি।

বর্তমানে দেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকর থাকলেও সেটি মূলত পরিবহন ব্যবস্থাপনা, লাইসেন্স ও নিবন্ধনকেন্দ্রিক। অথচ আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনাপরবর্তী জরুরি চিকিৎসা—এই পাঁচটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণেই একটি পৃথক, আধুনিক ও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন সময়ের দাবি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের সুপারিশ অনুযায়ী, একটি কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ-এর ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় গতিসীমা ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল এবং হেলমেট ব্যবহার বাস্তবায়ন গাইডলাইন প্রণয়নের ঘোষণাও দিয়েছে। এগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে সড়ক নিরাপত্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।

তবে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল ট্রাফিক নজরদারি, ডোপ টেস্ট, পেশাদার চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, লাইসেন্স প্রদানে স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর ফিটনেস পরীক্ষা, স্বাধীন দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যবস্থা এবং স্কুল পর্যায় থেকে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নিঃসন্দেহে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে হলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় সরকার, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং পরিবহন খাতের অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে। পর্যাপ্ত বাজেট, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ছাড়া এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

সরকার যদি ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আইনটি প্রণয়ন করে এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে রোডক্র্যাশে মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে। এর অর্থ হবে প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার মানুষের জীবন রক্ষা এবং হাজার হাজার পরিবারকে অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো।

আমি সরকারকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির জন্য অভিনন্দন জানাই। একই সঙ্গে আমার প্রত্যাশা—সড়ক নিরাপত্তা আইন শুধু প্রণয়নই নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত হোক। কারণ একটি শক্তিশালী আইন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল দেশের প্রতিটি সড়কে, প্রতিটি যাত্রায় এবং প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে।

সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন হোক, কার্যকর বাস্তবায়ন হোক—এটাই আমার প্রত্যাশা।

লেখক: তরিকুল ইসলাম, অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), রোড সেফটি প্রকল্প, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন