খাবারের পেছনেই মানুষের আয়ের ৬০ শতাংশ ব্যয়: সিপিডি

সাধারণ মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কিনতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ব্যয় আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর পেছনে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী, বাজারে আধিপত্য এবং অসাধু সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণায় বলা হয়, খাদ্যের দামের সামান্য বৃদ্ধি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলে। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট উপার্জনের অন্তত অর্ধেক খাবারের পেছনে ব্যয় করে। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে প্রকৃত আয় কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ায় মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ব্যয় কমিয়ে খাবার কিনতে হচ্ছে।

সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কেবল উৎপাদন খরচ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে কমিশন এজেন্ট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী থেকে বড় আমদানিকারক পর্যন্ত অনেকেই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বা সিন্ডিকেট গড়ে মূল্য নির্ধারণ করেন। ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণের সুযোগ পান।

সেমিনারে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, খাদ্যের দাম কেন বাড়ে, এর উত্তর এত সহজ নয়। উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদন ক্ষতি, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি ও প্রতিযোগিতা—সবকিছুই এখানে ভূমিকা রাখে।

কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে দামের ব্যবধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলে অনেক অংশীজন রয়েছে। ফড়িয়া, ব্যাপারীসহ বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেই পণ্যের দাম ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, বাজার কাঠামো, মধ্যস্বত্বভোগী, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং বাজারে আধিপত্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী। দেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) ৫৯ শতাংশই খাদ্যপণ্য। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

তার ভাষ্যে, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় মানুষকে সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণ নিতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বেতন বাড়লেও ভোক্তারা তার সুফল পাচ্ছেন না। একই অর্থে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারছেন এবং জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

গবেষণায় বাজার ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও তুলে ধরা হয়। ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০টির মধ্যে ৬টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতা প্রধানত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে।

চালের সরবরাহ শৃঙ্খলে উৎপাদকের পর রয়েছে ব্যাপারী, অটো রাইস মিলার, শহুরে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা। এই শৃঙ্খলে মিলারদের পর্যায়েই মূল্য অস্বাভাবিকতার হার সবচেয়ে বেশি।

তবে সিপিডি বলছে, সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ হলেই মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূল্যবৃদ্ধির একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সেই স্তরগুলো বাজারে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, খামার পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির হার সবুজ মরিচে ১১৬ শতাংশ, চালে ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ, আলুতে ৫০ শতাংশ, ডিমে ২৫ শতাংশ, মুরগিতে ২২ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ এবং রুই মাছে ১০ শতাংশ।