পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। নতুন বাজেটে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বরাদ্দ আগের অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ২৩৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা প্রায় ২৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও মশক নিয়ন্ত্রণ খাতের বরাদ্দও প্রায় ১২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) নগর ভবন অডিটোরিয়ামে ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম এ বাজেট ঘোষণা করেন। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮১৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, উন্নয়ন আয় ১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, পরিচালন ও মূলধন ব্যয় ১ হাজার ৫৫৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
পরিচ্ছন্নতা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি
এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২৭ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের ৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২৩৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা প্রায় ২৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, নতুন বরাদ্দ আগের তুলনায় প্রায় ৩.৬ গুণ। এই অর্থের মধ্যে অনিয়মিত পরিচ্ছন্নতা শ্রমিকদের মজুরির জন্য ১৮০ কোটি টাকা, ড্রেন পরিষ্কারে ৫৫ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় ভাগাড় উন্নয়নে ২০ কোটি টাকা, ভারী বর্জ্যবাহী যানবাহন আধুনিকায়নে ১০ কোটি টাকা এবং ডাস্টবিন ও কনটেইনার কেনা ও মেরামতে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘ক্লিন কেয়ার’ অ্যাপ ও হটলাইন চালু, প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালন, ছয়টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) উন্নয়ন, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে ‘রিসোর্স সার্কুলেশন পার্ক’-এ রূপান্তর এবং নতুন কম্পোস্ট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১২০ শতাংশ। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য ও মশক নিয়ন্ত্রণ খাতে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা প্রায় ১২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের মজুরিতে ৫৫ কোটি টাকা, কীটনাশক কেনায় ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, জ্বালানি ব্যয়ে ৮ কোটি টাকা এবং মশক নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি কেনায় ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
সড়ক উন্নয়নেই সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন ব্যয়
মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন ব্যয় ৮০৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এই খাতে সবচেয়ে বেশি ৫২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য।
এ ছাড়া কাঁচপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণে ৪০ কোটি টাকা, বুয়েটের সহায়তায় ২২টি ইন্টারসেকশনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনে ৪০ কোটি টাকা, ধানমন্ডি লেক উন্নয়নে ৪৫ কোটি টাকা এবং বৃক্ষরোপণ ও বনায়নে ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চলমান সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ৫৫৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে ইনার সার্কুলার রিং রোড প্রকল্পে ২৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, খাল পুনরুদ্ধার ও সংস্কারে ১৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, হোসনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক প্রকল্পে ৯৬ কোটি টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি ও ম্যাকানাইজড পার্কিংয়ে ৩৬ কোটি টাকা এবং কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রক্রিয়াধীন অন্যান্য ডিপিপি প্রকল্পে মোট ৫১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডে সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ উন্নয়নে ১৯০ কোটি টাকা, প্রধান সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত সংস্কারে ১৮০ কোটি টাকা, অঞ্চল ২, ৪ ও ৭-এর অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং ছয়টি কমিউনিটি সেন্টার আধুনিকায়নে ২০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
জলাবদ্ধতা কমাতে ৭৫টি ওয়ার্ডে ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থান (হটস্পট) চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পোর্টেবল পাম্প ও সাকার মেশিন মোতায়েন করা হবে। এ ছাড়া ৫৭টি ওয়ার্ডের জন্য ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)-কে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুটি প্রধান আউটলেটের অনুমোদনও পাওয়া গেছে।
নতুন কর নয়, করজাল সম্প্রসারণে জোর
বাজেটে নাগরিকদের ওপর নতুন কোনো কর আরোপ বা বিদ্যমান করের হার বৃদ্ধি করা হয়নি। রাজস্ব বাড়াতে জিআইএসভিত্তিক ডিজিটাল জরিপ, নতুন হোল্ডিং মূল্যায়ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার অটোমেশনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাজস্ব আয়ের মধ্যে পৌরকর ও অন্যান্য কর থেকে ৯৪১ কোটি ৯ লাখ টাকা, সড়ক খনন ফি থেকে ২০০ কোটি টাকা, ট্রেড লাইসেন্স থেকে ১৫০ কোটি টাকা, দোকান ও টার্মিনাল ভাড়া থেকে ৬০ কোটি টাকা, পাবলিক টয়লেট ইজারা থেকে ২৫ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞাপন কর থেকে ২৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জনস্বার্থে কবরস্থান ও শ্মশানঘাটে দাফন ও দাহ ফি ১ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি কবর ডিজিটাল নম্বরিংয়ের আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।