আবার কি আগের চেহারায় ফিরবেন খোকন

জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত খোকন চন্দ্র বর্মণকে চিকিৎসার জন্য আবার রাশিয়ায় পাঠাবে সরকার। সব কিছু ঠিক থাকলে তিনি আগামী আগস্টে যাবেন। এবার তার শরীরের হাড় নিয়ে নাক বসানো হবে। এখনো এক চোখে দেখেন না তিনি। নাক ছাড়াও রাশিয়ার তার মুখের অবয়ব তৈরি এবং বাঁ পাশে কৃত্রিম চোখ স্থাপন করা হবে। বসানো হবে মাড়ির দাঁতগুলো। এর আগে আড়াই মাস রাশিয়ায় তার চিকিৎসা চলে। দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলছে চিকিৎসা। স্বাভাবিক জীবন হয়তো ফিরে পারবেন না, তবে মোটামুটি একটা পর্যায়ে আসতেও আরও অনেকটা লাগবে। কবে আবার আগের চেহারায় ফিরবেন খোকন তা এখনো নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল।

গুলিতে খোকন বর্মণের মুখের এমন অবস্থা হয়েছিল যে, আয়নায় নিজেকে দেখে ভয় পেতেন তিনি। শুধু নিজেই নয়, অন্যরাও তাকে দেখলে ভয় পেত। রাশিয়ায় চলাচলের সময়ও তিনি মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে হাঁটতেন, যাতে কেউ দেখে ভয় না পায়। খোকন বর্মণের কাছে মনে হয়, তার আত্মাটাই শুধু আছে। সৃষ্টিকর্তা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। না হলে বেঁচে থাকার কথা নয়। সেই দুঃসহ স্মৃতি মনে হলে তিনি আঁতকে ওঠেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই যাত্রাবাড়ী থানার পাশে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন খোকন বর্মণ। থানা থেকে পূর্ব দিকে ফ্লাইওভারের একটি পিলারের পাশে খোকনসহ আরও ১৫-২০ জন আশ্রয় নেন। সেখানেও পুলিশ গুলি চালায়। তখন খোকন দৌড় দেন। আর তখন তার পায়ে গুলি লাগে। রাস্তার পাশে রাখা যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তের ড্রামের পাশে গিয়ে বসে পড়েন খোকন। সেখানে গিয়েই তার মুখ বরাবর গুলি চালায় পুলিশ।

খোকনের ভাষ্য, পুলিশ তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। হাত জোড় করে গুলি না চালানোর আকুতি করেছিলেন। কিন্তু তাতে গলেনি নিষ্ঠুর সেই পুলিশের মন। খোকনের মৃত্যু নিশ্চিত মনে করে পুলিশ চলে যায়। এরপর শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেই থেকে এখনো চলছে তারা চিকিৎসা।

পেশায় প্রাইভেটকার চালক খোকন শেরপুর জেলার উত্তর কাপাসিয়া উপজেলার নালিতাবাড়ি গ্রামের কিনা চন্দ্র ম-লের ছেলে। থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। পরিবারের অন্যরা থাকত ঢাকার মহাখালী। ঘটনার দিন সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঢাকায় আসছিলেন খোকন। তার ভাষ্য, সেদিন মানুষ ছিল প্রায় লাখের কাছাকাছি। খোকন এক চোখে দেখেন না। চোখটি প্রায় বন্ধ। নাকের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মুখ প্রায় মিলে যায় আরেক চোখের সঙ্গে। মুখের ওপরের পাটির দাঁত নেই। নিচের পাটিরও কয়েকটি দাঁত ফেলে দিতে হয়। কথা বলতে গেলে তার গলা পর্যন্ত দেখা যেত। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য একটি ক্যানুলা যুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল, যেটি নাক বরাবর কপালে স্কচটেপ দিয়ে লাগানো থাকত এবং কানের পাশ নিয়ে নেমে গলার কাছে ঝুলে থাকত। এভাবেই কয়েক মাস কেটেছে ২৩ বছরের খোকন বর্মণের। এরপর ২০২৫ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি খরচে তাকে রাশিয়া পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় আড়াই মাস চিকিৎসার পর তাকে দেশে নিয়ে আসা হয়। রাশিয়া নেওয়ার আগে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তী ধাপের চিকিৎসা জন্য তাকে আবার আগামী আগস্টে রাশিয়ায় পাঠানো হবে।

প্রথম ধাপে রাশিয়ায় ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল খোকনের অস্ত্রোপচার হয়। তার মুখের পুনর্গঠন অস্ত্রোপচারের লক্ষ্যে প্রথমে খোকনের মুখের থ্রি-ডি মডেল তৈরি করা হয়। পরে তার নিচের চোয়ালে টাইটানিয়ামের পাত বসানো হয় এবং অস্টিওসিন্থেসিস করা হয়। অস্ত্রোপচারের সময় খোকনের মুখ থেকে তিন-চারটি ছররা গুলির অংশবিশেষও বের করা হয়।

খোকন বলেন, ভিসা রেডি হলেও বিমানের টিকিট হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছে, আগামী আগস্টে তাকে নিয়ে যাবে। শুনেছি মাড়ি, নাক এগুলো বসানো হবে। এক চোখ নষ্ট। আরেক চোখ দিয়ে বেশিদূর যেতেও পারি না। এবার গেলে আরও উন্নতি হবে বলে আশা খোকনের।

রাশিয়া থেকে ফিরে খোকন গ্রামে মা-ভাইয়ের কাছে থাকেন। তার বাবা থাকেন ঢাকায়। তবে এবার জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রকার ভয়-বাধা ছাড়া ভোট দিতে পেরে খুব খুশি খোকন। তবে বিচার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে খোকন বলেন, এখনো বিচার দেখছি না। যাদের কারণে আমি এবং আমার মতো হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে, শত শত শহীদ হয়েছেন, দোষীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি শান্তি পাচ্ছি না। তিনি বলেন, দৃশ্যমান কিছু দেখছি না। কবে যে তাদের বিচার হবে তাও জানি না। অন্তত তাদের বিচার হলেও মনটা শান্তি পেত। আমি তো চলতে-ফিরতে পারি। অনেকেই আছেন চলতে পারে না। চোখে দেখে না। দুই চোখই অন্ধ। সে জন্য দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। আমরা এগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।