চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নিহত রাজশাহীর দুই শহীদ আলী রায়হান ও সাকিব আনজুম হত্যাকা-ের বিচারের ধীরগতিতে দুই পরিবারে এখন হতাশার ছাপ। শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, গত দুই বছরে তারা প্রত্যাশিত সম্মান থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। যে আকাক্সক্ষা নিয়ে তাদের সন্তানরা জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেটি পূরণ হয়নি। তাদের অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীরাও এখন লক্ষ্যচ্যুত হয়েছেন। তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারের পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে রাজশাহী শহরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেদিন দুপুরে নগরের আলুপট্টি এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষে নিহত হন সাকিব আনজুম ও আলী রায়হান। আহত হন আরও অনেকে। প্রায় দুই বছর পরও বহুল আলোচিত এ দুই হত্যাকা-ের বিচার শেষ হয়নি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে স্বজনদের মধ্যে।
রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ফিনল্যান্ডে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাকিব আনজুম। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। ছেলে হারানোর শোকের পাশাপাশি বিচারহীনতার আশঙ্কাও তাড়া করছে তার পরিবারকে। সাকিবের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। তাকে যারা হত্যা করেছে, তাদের যেন সঠিক বিচার হয়। বিচার হলেই কিছুটা সান্ত¡না পাব।
সাকিবের বাবা মাইনুল ইসলাম বলেন, আমার ছেলে দেশকে ফ্যাসিবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত করার স্বপ্ন নিয়েই শহীদ হয়েছে। কিন্তু দুই বছরেও সেই আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন দেখছি না। মামলারও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। দেশটাও তো বদলায়নি। এখন আমাদের চাওয়া হলো, সঠিক বিচার যেন হয়। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সমন্বয়কদের সম্পর্কে তিনি বলেন, এই যে নতুন একটা দল গঠন হলো এনসিপি, এরাও তো শহীদ পরিবারের খোঁজই করে না।
একই ঘটনায় আহত হয়ে পরে মারা যান রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী আলী রায়হান। তার পরিবারও বিচার নিয়ে হতাশ। আলী রায়হানের ভাই রানা ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু দুই বছর পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। মামলার চার্জশিট হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে আমাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। আলী রায়হানের বাবা মুসলেম উদ্দিন বলেন, তখন আমাদের ছেলেরা আত্মগোপনেরও সুযোগ পায়নি। অথচ এখন অনেক অভিযুক্ত প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসনের ভূমিকা আমাদের হতাশ করছে।
রাজশাহীর আলোচিত এই দুই হত্যাকা-ের বিচারের কার্যক্রম এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই দুই হত্যা মামলার চার্জশিট দেয় পুলিশ। দুটি হত্যা মামলায় শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, রাজশাহীর সাবেক সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনসহ ২৪৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মামলা আর বেশি সামনে এগোয়নি। মামলার অগ্রগতি না দেখে বিচারপ্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলছেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা।
রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আলী আশরাফ মাসুম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাজশাহী শহরের দুই হত্যা মামলার চার্জশিট ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মামলাটা ইনভেস্টিগেশন করছে। তাদের টিম আছে। আইসিটি চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনিও রাজশাহী আসতে চেয়েছেন। যে চার্জশিট হয়েছে তার অধিকতর তদন্ত চেয়েছি। সঠিক তদন্ত শেষে পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরু হবে। আশা করছি, এই মামলায় বাদীপক্ষ ন্যায়বিচারই পাবেন।