সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ভাষাও বদলে যায়। তবে রাজধানীর ফুটপাত দখল করে থাকা হকারদের পেছনের অদৃশ্য শক্তি টিকে থাকে। সময়ের সঙ্গে শুধু বদলায় মুখ, বদলায় প্রভাবশালীদের পরিচয়। চাঁদাবাজির শৃঙ্খল, দখলের সংস্কৃতি কিংবা ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের দৃশ্য অপরিবর্তিত থেকে যায়। এতে পথচারীর দুর্ভোগ বহাল থাকার পাশাপাশি হকারদের জীবনও বন্দি থাকে অনিশ্চিত বাস্তবতার মধ্যে। মাঝখান থেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের পকেটের ওজন বাড়তেই থাকে।
দেশ রূপান্তরের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন ফুটপাতে হকার বসানোর পেছনে মূল ভূমিকা রাখছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে হকারদের নিয়ন্ত্রকদের মুখগুলো শুধু বদলায়, যে দল ক্ষমতায় আসে তাদের অনুগতরা দখল করেন আগের নিয়ন্ত্রকদের জায়গা। এই চক্রপ্রবাহ চলছে দশকের পর দশক। তাদের সঙ্গে পুলিশসহ নগর ব্যবস্থাপনায় জড়িত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও জড়িত। সব মিলিয়ে হকারদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে যে ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে তার শেকড় অনেক গভীরে। এই ইকোসিস্টেম না ভেঙে কেবল একতরফা হকার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে কোনো সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে রাজধানীর পল্টন মোড় থেকে জিপিও জিরো পয়েন্ট চত্বর পর্যন্ত ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নিতেন তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের অনুসারীরা। এছাড়া মহানগর দক্ষিণ শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. ইব্রাহিম খান, সাধারণ সম্পাদক কাজী সেলিম সারোয়ার, পল্টন থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি মোস্তফা জামান মিন্টুর অনুসারীরাও জড়িত ছিলেন চাঁদাবাজিতে। অভিযোগ আছে, পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে চাঁদা নিতেন সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ ফাঁড়ির তখনকার ইনচার্জ এসআই ওবায়েদুর রহমান, পল্টন থানার ওসি মোল্লা মো. খালিদ হোসেন, মতিঝিল বিভাগের ডিসি আব্দুল আহাদ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা চাঁদা না তুললেও পুলিশ কর্তারা ঠিকই টাকা নিয়েছেন। এরপর ক্ষমতায় আসে বিএনপি। বর্তমানে এই এলাকার হকারদের কাছ থেকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের পল্টন থানার আহ্বায়ক আবু তাহের, যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল খান, সদস্য সচিব সুমন হোসেন চাঁদা নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের মাধ্যমে তোলা চাঁদার একটি ভাগ যায় সিটি করপোরেশনের কয়েক স্তরের কর্মকর্তার কাছে। পুলিশের মধ্যে সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ ফাঁড়ির বর্তমান ইনচার্জ (এসআই) বিমান তরফদার, এএসআই কামরুজ্জামান, পল্টন থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান, পল্টন জোনের এসি পার্থ প্রতিম বিশ্বাস, মতিঝিল বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ ও শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান চাঁদার ভাগ পান বলে অভিযোগ এসেছে।
আওয়ামী লীগের ১৭ বছর, অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছর এবং বর্তমানে কারা ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছেন তা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে দেশ রূপান্তর। এতে গুলিস্তান একাংশের মতো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বসা হকারদের কাছ থেকেও বছরের পর বছর চাঁদা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ক্ষমতার পালাবদলে শুধু চাঁদা তোলায় জড়িতদের মুখ বদলেছে, কিন্তু চাঁদাবাজির সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
রাজনৈতিক নেতা-পুলিশ মিলেমিশে চাঁদাবাজি : জিরো পয়েন্ট থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেট হয়ে স্টেডিয়াম মার্কেটের গেট পর্যন্ত ফুটপাতে দুই শতাধিক চৌকি-টেবিলে হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে বসেন হকাররা। মূল সড়কেও বসানো হয়েছে দুই স্তরের ভাসমান দোকান। এখানকার ফুটপাতে একটি দোকান বসাতে চাইলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এমন প্রশ্ন নিয়ে সম্প্রতি একাধিক হকারের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। একজন হকার ওই এলাকার চশমা দোকানি ইব্রাহীম খানকে দেখিয়ে দেন। ইব্রাহীম আবার দেখিয়ে দেন গেঞ্জি বিক্রেতা রেজাউল করিমকে (তিনি একইসঙ্গে পল্টন থানা শ্রমিক দলের কর্মী)। রেজাউলের কাছে আর্জি জানাতেই তিনি বলেন, ‘আমি লাইনম্যানের কাজ করি। দোকান বসাতে হলে পল্টন থানা শ্রমিক দলের সদস্য সচিব সুমনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’ সুমনের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় জানতে চাইলে রেজাউল নিজের মোবাইল ফোনের স্পিকার অন রেখে তাকে কল করেন। সুমন ফোন ধরতেই রেজাউল বলেন, ‘ভাই কই আছেন, এক ভাইয়ের একটা দোহান বহান লাগে যে।’ অন্যপ্রান্ত থেকে সুমন বলেন, ‘তুই-ই কথা বল, তুই তো সব জানোস। ওভাবে হইলে বহাইয়া দে।’
এরপর রেজাউল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছোট চৌকি বসাতে পারবেন। এককালীন ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। আর দৈনিক অন্য হকারের মতো ১০০ টাকা করে আমাদের দিতে হবে। সন্ধ্যায় বিদ্যুতের আলাদা লাইনম্যানকে ৫০ টাকা দিতে হবে। এই শর্তে রাজি হলে আমি ব্যবস্থা করে দেব।’
দৈনিক ১০০ টাকার কিছু কম দেওয়া সম্ভব কি না এমন প্রশ্নে রেজাউল সাফ জানিয়ে দেন ‘অসম্ভব’। তার দাবি, ‘এই ১০০ টাকার মধ্যে ৩০ টাকা আহাদ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিমান তরফদার ও এসি পার্থ প্রতীম বিশ্বাসকে দিতে হয়, ৪০ টাকা দিতে হয় পল্টন থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান ও মতিঝিলের ডিসিকে। বাকি ৩০ টাকা পল্টন থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক আবু তাহের, যুগ্ম আহ্বায়ক রাসেল ও সদস্য সুমন ভাইরা নেন। তারা দলীয় কর্মী ও অফিসের পেছনে এই টাকা ব্যয় করেন।’
এই অভিযোগ অবশ্য এক কথায় উড়িয়ে দিয়েছেন পল্টন থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক আবু তাহের। তিনি দেশ রূপান্তরকে, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ টোটালি মিথ্যা। বরং পুলিশ হকারদের ধরে নিয়ে যায়। পরে প্রস্তাব দেয় ফুটপাত থেকে টাকা তুলে দিতে। বাধ্য হয়ে অনেক হকার টাকা তুলে পুলিশকে দেয়। ঈদের আগে ফুটপাত থেকে আমার ১২ জন কর্মীকে নিয়ে যায়। পরে বলেকয়ে ছাড়িয়ে এনেছি। পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়টি দলের শীর্ষ নেতাদেরও অবগত করেছি।’
গত ৪ জুলাই সন্ধ্যা। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে বসা হকারদের কাছ থেকে হেঁটে হেঁটে টাকা তুলছিলেন এক যুবক। দোকান বসানোর কথা বলে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন এই প্রতিবেদক। ওই যুবক জানান, তার নাম মেহেদী হাসান মিহির। তিনিও দোকানপ্রতি দৈনিক ১০০ টাকা করে চাঁদা তোলেন। এই টাকা শাহবাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রুবেলকে বুঝিয়ে দিতে হয় বলেও তিনি জানান। দাবি করেন, রুবেলের মাধ্যমে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা টাকার ভাগ পান। তবে এই অভিযোগ নিয়ে রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গোলাপশাহ মাজারের পশ্চিম পাশের ফুটপাতে একটি টিনশেড অফিস বানিয়ে সেখানে বসেন শাহবাগ থানা শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা। ওই অংশের হকারদের থেকে চাঁদা নেওয়ার পেছনে নাম এসেছে শাহবাগ থানা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিনের। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কেউ আমার নাম বলতে পারে। হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সরকারদলীয় লোক হয়েও আমি বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছি।’
একই কৌশলে অনুসন্ধান চালানো হয় ট্রেড সেন্টারের সামনের ফুটপাত এবং আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসের সামনে থেকে গুলিস্তান পাতাল মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাতে। এই অংশে কয়েকশ হকারের থেকে চাঁদা তোলেন কামাল হোসেন ও সেলিম খান নামের দুজন লাইনম্যান। তারা পল্টন থানা পুলিশ, আহাদ পুলিশ ফাঁড়ি ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইমাম হোসেন ইমন চৌধুরীকে চাঁদার ভাগ বুঝিয়ে দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে ইমাম হোসেন ইমন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, ট্রেড সেন্টারে তার নিজস্ব ব্যবসা রয়েছে। ট্রাউজার বানানোর কারখানা আছে। এর বাইরে তিনি কোনো অবৈধ কাজ করেন না।
ফুলবাড়িয়া, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট, কাপ্তান বাজার, স্টেডিয়াম, বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট এলাকায় হকারদের নিয়ন্ত্রণকারীদের সহকারী হিসেবে আছেন মিজানুর রহমান, জাফর, আরিফুল ইসলাম, সেলিম খান, আনিসুর রহমান, খোরশেদ আলম, ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিপ্লবুল হক বিপ্লব, তার ভাই কালুসহ ২০-৩০ জনের একটি দল। তাদের মধ্যে অনেকে নিজেরাই হকার ছিলেন। বর্তমানে কর্মচারী রেখে দোকান পরিচালনা করছেন। গুলিস্তানের বিভিন্ন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, তারা হকার সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়। কেননা সামনের ফুটপাত দখল করে হকার বসার কারণে ক্রেতারা মার্কেটে প্রবেশে বাধা পাচ্ছেন। মার্কেট ব্যবসায়ীরা নিজস্ব মালামাল চাইলেও দোকানের সামনে রাখতে পারেন না। হকারদের সরে যেতে বললে তারা লাইনম্যান ও নেতাদের ডেকে নিয়ে এসে হুমকি দিচ্ছেন।
বিদ্যুৎ মিটার বসিয়ে চাঁদাবাজি : সরকারের বিদ্যুৎ সংকোচন নীতি মেনে গুলিস্তান এলাকার শত শত খুচরা ও পাইকারি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সময়ে দোকানপাট বন্ধ করলেও হাজার হাজার হকার এর তোয়াক্কা করছেন না। গভীর রাত পর্যন্ত তারা দোকান খোলা রাখেন। সন্ধ্যা নামলেই এসব দোকানে জ্বলে ওঠে বাতি। অথচ হকারদের জন্য নিজস্ব কোনো মিটার নেই। তাদের দোকানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের পেছনে স্থানীয় সরকারদলীয় নেতা ও বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম পাওয়া গেছে।
গুলিস্তান বেলপট্টি থেকে বের হয়ে ডানে ও বাঁয়ের মূল সড়কে বসা দুই শতাধিক হকারকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় শাহবাগ থানার ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক নূর নবীর মিটার থেকে। একেক জন হকার দৈনিক ২/৩ ইউনিট কিংবা ২০-২৫ টাকার বিদ্যুৎ খরচ করেন। অথচ হকারপ্রতি বিল নেওয়া হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় নূর নবীর লাইনম্যানরা এই টাকা তোলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নূর নবী অকপটে অভিযোগ স্বীকার করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ফুটপাতে হকার বসিয়ে টাকা নিই না। তবে রাস্তার দুই সাইডের হকাররা আমার মিটার থেকে বিদ্যুতের লাইন নিয়েছে। এতে মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা বিল আসে। সেই টাকা আমি লোক দিয়ে তুলি।’
একেকজন হকার যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করেন তার দ্বিগুণ বিল আদায়ের অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত মিটার থেকে এভাবে হকারদের লাইন দেওয়া নিষেধ। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে হয়। তাই কিছুটা বেশি নিই। ফুটে (ফুটপাতে) হিউজ চাঁদাবাজি হয়। দলের কয়েকজন নেতাই চাঁদা নেন, পুলিশকে দেন। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকতাও চাঁদার ভাগ পান।’
ব্যাঙের ছাতার মতো দলীয় অফিস : গুলিস্তান এলাকায় গড়ে উঠেছে দলীয় একাধিক অফিস। টিনশেড বা ঝুপড়ি ঘর, পরিত্যক্ত ভবনে গড়ে ওঠা এসব অফিসের সামনে টাঙানো হয়েছে বিভিন্ন ইউনিটের নামে সাইনবোর্ড। অফিসে সার্বক্ষণিক ১০-১৫ জন দলীয় কর্মী উপস্থিত থাকেন। অভিযোগ আছে তারা মূলত বিভিন্ন স্পটের নিয়ন্ত্রক। কমিটির শীর্ষ নেতারা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কার্যালয়ে যান। লাইনম্যানরা চাঁদা তুলে আনার পর গভীর রাত পর্যন্ত ভাগ-বাটোয়ারা চলে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সমবায় টুইন টাওয়ার মার্কেটের পাশে টিনশেড দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিএনপির শাহবাগ থানার ২০ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়। গোলাপ শাহ মাজারের পাশে ‘বাস বে’ সংলগ্ন ফুটপাতে টিনশেড দিয়ে বানানো হয়েছে শাহবাগ থানা শ্রমিক দলের কার্যালয়। পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন বেলপট্টিতে সেমিপাকা ঘর বানানো হয়েছে যুবদলের অফিস হিসেবে। মোড় ঘুরে দশ কদম সামনে যেতেই ‘২০ নম্বর বেলপট্টি ইউনিট বিএনপি’ নামে আরেকটি অফিস রয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশের পরিত্যক্ত ভবনের নিচতলায় ২০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের আরেকটি সাইনবোর্ড টাঙানো। গত ৭ জুলাই দুপুরে ওই অফিসে ঢুকতেই দেখা যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় ছোট ছোট বেঞ্চের মতো টেবিলে তিনজন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আর দুজন বসে গল্প করছেন।
একই চিত্র নিউ মার্কেট এলাকায় : গুলিস্তানের মতো নিউ মার্কেট এলাকাতেও অনুসন্ধান চালান এই প্রতিবেদক। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে নিউ মার্কেট এলাকার হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নিতেন নিউ মার্কেট থানা আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি হানিফ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মো. মনু মিয়া, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম লিটন, আইয়ুব আলী ইউনিটের সভাপতি সাত্তার মোল্লাসহ তাদের অনুসারীরা। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কিছু নেতাও এ কাজ করতেন। বর্তমানে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন। নিউ মার্কেট থানা পুলিশ ও পূর্ব ধানম-ি পুলিশ ফাঁড়ির কিছু কর্মকর্তার নামও এসেছে।
নীলক্ষেত মোড়ের পশ্চিম পাশ থেকে নিউ মার্কেট ৪ নম্বর গেট পর্যন্ত বসা হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলেন জহিরুল ইসলাম ও ফুট মিজান। জহির নিজেও একাধিক দোকান বসিয়েছেন। অভিযোগ আছে, তারা টাকা তুলে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেনকে দেন। আমিরের মাধ্যমে এই টাকা দলের আরও উঁচু পর্যায়ে এবং সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তার কাছেও যায়। আমির নিজেও এই অংশে একাধিক দোকান বসিয়ে লোকজন দিয়ে পরিচালনা করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আমির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আগে ফুটপাতে ব্যাগ বিক্রি করতাম। এখন আমার দুটি দোকান রয়েছে। ছোট ভাই দিয়ে পরিচালনা করি। আমি ফুটপাত থেকে চাঁদার ভাগ নিই না।’
ব্যবসায়ীরা জানান, নিউ মার্কেটের পূর্ব পাশের বইয়ের দোকান থেকে চাঁদনী চক, জুতাপট্টি, এলিফ্যান্ট রোডের কয়েকশ দোকান থেকে চাঁদা নেন নিউ মার্কেট থানা যুবদলের সভাপতি মিজান ব্যাপারী। তিনিও ১২০টি দোকান বসিয়ে নিজস্ব লোক দিয়ে পরিচালনা করছেন। অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ফোনে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
নিউ মার্কেট পোস্ট অফিস সংলগ্ন ময়লার ভাগাড়ের আশপাশ এবং আইয়ুব আলী কলোনি পর্যন্ত বসা দোকান থেকে সপ্তাহে ৫০ হাজার এবং নিউ মার্কেট থেকে কামরাঙ্গীরচরে যাতায়াতকারী অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড থেকে মাসে ২০ হাজার টাকা নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের ছাত্রদল নেতা তৌহিদুল হক তৌহিদ। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ বলেন, ‘চাঁদাবাজির বিষয়ে আমার নাম আসায় হকারদের ডাকা হয়েছে। তাদের বলে দিয়েছি আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদা চাইলে যেন না দেওয়া হয়।’
বড় দোকান ছোট করে চাঁদা তুলছে ঢাকা কলেজ ছাত্রদল : অনুসন্ধানে জানা গেছে ঢাকা কলেজের সামনে ও বিপরীতে বসা পুরনো অনেক হকারকে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে উঠিয়ে দেন ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা। এ নিয়ে অনেকদিন ঝামেলা চলে। পরে হকারদের বড় চৌকি ছোট করতে নির্দেশ দেন ক্যাম্পাসের নেতারা। এতে করে যে জায়গা খালি হয়েছিল সেখানে নতুন চৌকি বসিয়ে নতুন হকারদের বসার বন্দোবস্ত করা হয়। এককালীন ও দৈনিক চাঁদার ভিত্তিতে এসব জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে।
সংগঠনের কলেজ শাখার আহ্বায়ক পিয়াল হাসানের আস্থাভাজন যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম শেখ, জিয়াউর রহমান খন্দকার, মেহেদী হাসান, সুমন শিকদার, আহ্বায়ক সদস্য লিয়ন, পারভেজ মোশাররফ, শরীফুল ইসলাম, সাগর খান এবং বহিষ্কৃত আহ্বায়ক সদস্য জীবন সেখানে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা গেছে। ক্যাম্পাসে সুপার ফাইভে থাকা যুগ্ম আহ্বায়ক মামুনুর রহমান মামুন, আহ্বায়ক সদস্য সিরাজুম মুনির নায়েব, শামীম হাওলাদার, রোকন উদ্দিনের নামও এসেছে। স্থানীয় হকাররা জানান, ফুটপাত দখল নিয়ে বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদুল আমীন, তারেক জামিল ও এনামুল শান্তর সঙ্গে নিউ মার্কেট যুবদল নেতা মিজান বেপারীর সঙ্গে একাধিকবার বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা সবাই জানেন।
তবে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক পিয়াল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই। অনুসারী কেউ আমার নাম ভাঙিয়ে যাতে এসব না করে, সে বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক মামুনুর রহমান মামুনকে একাধিকবার কল করা হলেও তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
নাম বলেন, ধইরা নিয়া আসি : হকারদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ এসেছে যেসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তারা প্রত্যেকেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, এমন অভিযোগ করা হকার বা লাইনম্যানদের নাম জানতে পারলেই তাদের থানায় ধরে নিয়ে আসবেন।
নিউ মার্কেট থানার ওসি মোহাম্মদ আইয়ুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ফুটপাত থেকে অবৈধ টাকা নিই না। যারা আমার নাম বলেছে, তাদের নাম বলেন, ধরে নিয়ে আসব।’ একই কথা বলেছেন শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান।
অন্যদিকে, পূর্ব ধানম-ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই খায়রুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মাসে ৪০/৫০ জন হকার ধরে চালান দিই। নিয়মিত অভিযান না চালালে চার স্তরের দোকান বসত। এসব কারণে কেউ আমার নাম বলতে পারে।’
গুলিস্তানে হকারদের থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আহাদ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই বিমান তরফদার বলেন, ‘আমি কয়েকদিন আগে যোগদান করেছি। ফুটের (ফুটপাত) টাকা আমি নিই না।’ পল্টন জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) পার্থ প্রতিম বিশ্বাস বলেন, ‘যারা নিজেরা চাঁদাবাজি করে আমার নাম বলছে, তাদের আমরাই খুঁজছি। শুধু নাম বলেন, তাকে ধরে নিয়ে আসব।’
অন্যদিকে পল্টন থানার ওসি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খানের দাবি, তিনি গুলিস্তানের দিকেই যান না। ফুটপাত থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কোন হকার বা লাইনম্যান তার নাম বলেছে, সেটিও সবিস্তারে তিনি জানতে চান এই প্রতিবেদকের কাছে। মোস্তফা কামাল খান বলেন, ‘আমি ওই এলাকার চাঁদাবাজ অভি, লিটন, কবিরসহ কয়েকজনের নাম ডিএমপি সদর দপ্তরে জমা দিয়েছি। হকারদের ধরে আনলেই তাদের ছাড়াতে নেতারা থানায় এসে বসে থাকেন।’
মতিঝিল বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে হকারদের উঠিয়ে দেওয়ায় এবং আটক করায় তারা বিরাগভাজন হয়ে আমার বিরুদ্ধে এসব কথা বলতে পারে। আর এসি, ওসি ও ফাঁড়ির ইনচার্জের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
সামগ্রিক বিষয়টি নজরে এনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) মোহাম্মদ ওসমান গনির বক্তব্য জানতে চেয়েছিলেন এই প্রতিবেদক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হকারদের কাছ থেকে কোনো পুলিশ সদস্য চাঁদা নিয়ে থাকলে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সেটি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’