ফ্রান্সে কমেছে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন, সুরক্ষা মিলছে মাত্র ৭.৪ শতাংশ

ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও বাংলাদেশ এখনও শীর্ষ আবেদনকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশি আবেদনকারীদের বড় অংশই আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিসংখ্যান একদিকে যেমন আশ্রয়প্রক্রিয়ার কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরছে, অন্যদিকে মানব পাচারকারী চক্রের মিথ্যা আশ্বাসে ইউরোপে আসার প্রবণতা থেকেও মানুষকে সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

ফ্রান্সের শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সুরক্ষাবিষয়ক দপ্তর অফপ্রার ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর দেশটিতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৭০টি আবেদন জমা পড়ে। ২০২৪ সালের তুলনায় আবেদন কমেছে ৫.৫ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রথমবারের আশ্রয় আবেদন ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৩৪৩টি, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪.৪ শতাংশ কম। অন্যদিকে পুনর্বিবেচনার আবেদন বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৭১৩টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ অনেক আবেদনকারী প্রথমবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পুনরায় আবেদন করেছেন। ইউক্রেন শীর্ষে, বাংলাদেশ নবম ২০২৫ সালে প্রথমবারের আশ্রয় আবেদনকারী দেশের তালিকায় ১১ হাজার ৯৮৯টি আবেদন নিয়ে ইউক্রেন প্রথম স্থানে উঠে এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখনও দেশটির নাগরিকদের ইউরোপমুখী করে রাখছে। এরপর রয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (১১ হাজার ৩৩৮), আফগানিস্তান (১০ হাজার ৮২২), গিনি, আইভরি কোস্ট, হাইতি, তুরস্ক ও সুদান। বাংলাদেশ রয়েছে নবম স্থানে। বাংলাদেশ থেকে ৩ হাজার ৮১৬ জন প্রথমবার আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৬.৭ শতাংশ কম। আবেদনকারীদের মধ্যে ১৮.৬ শতাংশ নারী এবং ৭.৩ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। সুরক্ষা স্বীকৃতির হার এখনও কম। 

অফপ্রার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম আবেদন, পুনর্বিবেচনা ও পুনরায় খোলা আবেদন মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে মোট ৪ হাজার ৫৩৪টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৯৩ জন শরণার্থী মর্যাদা বা সাবসিডিয়ারি প্রটেকশন পেয়েছেন। একই সময়ে ৪ হাজার ৯০৭টি আবেদনের বিষয়ে প্রত্যাখ্যানমূলক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে জমা পড়া মামলার নিষ্পত্তিও অন্তর্ভুক্ত করে।

অফপ্রা এবং ফরাসি জাতীয় আশ্রয় আদালত সিএনডিএ -এর সম্মিলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের মোট সুরক্ষা স্বীকৃতির হার মাত্র ৭.৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন আবেদনকারীর মধ্যে গড়ে মাত্র ৭ জন আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাচ্ছেন। 

অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, আশ্রয় আবেদন কোনো কর্মসংস্থান বা ইউরোপে বসবাসের বিকল্প পথ নয়। এটি কেবল তাদের জন্য, যারা নিজ দেশে নির্যাতন, যুদ্ধ বা গুরুতর ঝুঁকির মুখে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করতে সক্ষম হন। তারা বলছেন, মানব পাচারকারী চক্র প্রায়ই ইউরোপে সহজে আশ্রয় পাওয়া যাবে, দ্রুত বৈধ কাগজপত্র মিলবে বা স্থায়ীভাবে বসবাস করা যাবে বলে ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে বিপজ্জনক পথে বিদেশে পাঠায়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ আবেদন কঠোর আইনি যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায় এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে অনেকেই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, আইনি জটিলতা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ অভিবাসনপথ বেছে নেওয়া এবং কোনো দালাল বা মানব পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পা না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অফপ্রা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০টির বেশি সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১০.৩ শতাংশ বেশি। এ সময় আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পেয়েছেন ৭৮ হাজার ৭৮৩ জন এবং সামগ্রিক সুরক্ষা স্বীকৃতির হার দাঁড়িয়েছে ৪১.২ শতাংশ। একই সঙ্গে আবেদন নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর ফলে অপেক্ষমাণ মামলার সংখ্যা প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। এছাড়া শরণার্থী ও সুরক্ষা পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৭৯ হাজারের বেশি জন্মসনদ, বিবাহসনদ এবং অন্যান্য নাগরিক নথি ইস্যু করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২.৩ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশিদের জন্য এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বৈধ কারণ ও পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া আশ্রয় আবেদন সফল হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। তাই নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ বেছে নেওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত এবং মানব পাচারকারী চক্রের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে দূরে থাকতে হবে পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।