আজ ১ আগস্ট, ৮১ বছরে পা দিলেন বাংলা গানের কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী খুরশিদ আলম। শুধু জীবনের বর্ষপূর্তিই নয়, আজকের দিনটি তার সংগীতাঙ্গনের ক্যারিয়ারের জন্যও এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৬৯ সালের এই একই দিনে বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রে ‘বন্দি পাখির মতো’ গানে কণ্ঠ দিয়ে রুপালি পর্দায় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। জীবনের এই অনন্য মাইলফলকে দাঁড়িয়ে বিশেষ দিনটি তিনি পরিবারের প্রিয়জনদের সঙ্গেই একান্তভাবে উদযাপন করছেন।
কিংবদন্তি এই সুরসাধকের ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে আজ বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে চ্যানেল আই-তে প্রচারিত হবে শাইখ সিরাজ নির্মিত বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘হৃদয়ে কী সুর বাজে’। বরেণ্য এই শিল্পীর জীবনকর্ম, দীর্ঘ সংগীতচর্চা ও অনন্য শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে।
আজকের এই বিশেষ ক্ষণে নিজের অগণিত ভক্ত ও অনুরাগীদের প্রতি গভীর অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেছেন তিনি। প্রবীণ এই শিল্পী বলেন, ‘মানুষ আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তা না থাকলে আমি আজকের খুরশিদ আলম হতে পারতাম না। সংগীতের এই দীর্ঘ যাত্রায় চলচ্চিত্র, টেলিভিশন কিংবা মঞ্চ যেখানেই গেয়েছি, মানুষ আমাকে আপন করে নিয়েছে। শ্রোতাদের সেই ভালোবাসাই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে। চলার পথে কারও মনে কখনো অনিচ্ছাকৃত কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখবেন, সবার কাছে এটুকুই আমার চাওয়া।’
চলচ্চিত্রের সোনালি যুগে সাড়ে চার শতাধিক জনপ্রিয় গান উপহার দিলেও সমসাময়িক অনেক সহশিল্পীর মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার না পাওয়ার বিষয়টি তার হৃদয়ে কোনো আক্ষেপ তৈরি করেনি। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সমীকরণ টেনে বিন্দুমাত্র ক্ষোভ না রেখে সহজ হাসিতে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আক্ষেপ করলে আল্লাহর কাছে গুনাহ হবে, তিনি আমাকে অনেক দিয়েছেন। সরকার হয়তো আমাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেয়নি, কিন্তু এ দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। দেশের ১০ ভাগ মানুষও যদি আমার গান পছন্দ করে, তবে সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন ও অর্জন।’
নিজের এই দীর্ঘ সফল ক্যারিয়ারের নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোর কথা পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন খুরশিদ আলম। সুরকার আজাদ রহমান, শৈশবের সংগীত শিক্ষক শেখ আবুল ফজল, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অজিত কুমার গুহ এবং যার হাত ধরে সংগীতে আসা সেই আপন চাচা ড. আবু হায়দার সাজেদুর রহমানের অবদান তিনি চিরদিন স্মরণ করেন। সেই সঙ্গে যন্ত্রসংগীতশিল্পী থেকে শুরু করে প্রয়াত সুরকার ও গীতিকারদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ একা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এই মানুষগুলোর একটু একটু করে শেখানো আর সহযোগিতাতেই আজকের খুরশিদ আলমের জন্ম হয়েছে।’
১৯৪৬ সালের ১ আগস্ট পুরান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন খুরশিদ আলম। ১৯৬৫ সালে শেখ বোরহান উদ্দিন কলেজে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার মাধ্যমে তার পথচলা শুরু হলেও পরে রেডিওর আধুনিক গানে আত্মপ্রকাশ ঘটে। চলচ্চিত্রে নাম লেখানোর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ‘মাগো মা’, ‘চুমকি চলেছে একা পথে’, ‘মিসলংকা’, ‘ওই প্রেমের দরজা খুলো না’, ‘নাচ আমার ময়না’ কিংবা ‘এ আকাশকে সাক্ষী রেখে’র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়ে তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে একুশে পদক, ২০২৩ সালে ফিরোজা বেগম স্বর্ণপদকসহ দেশ-বিদেশে নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন কিংবদন্তি এই সংগীতসাধক।