উচ্চশিক্ষা ছুটি শেষেও নেই ফেরার নাম

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষকদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষক ৪২১ জন, যাদের মধ্যে  ১২২ জনই রয়েছেন শিক্ষাছুটিতে। যা মোট শিক্ষকের প্রায় ২৯ শতাংশ। জানা গেছে, বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতি তিন শিক্ষকের মধ্যে বর্তমানে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া পিএইচডি করতে বিদেশে যাওয়ার পর কোর্স শেষে দেশে ফিরে না এসে চাকরি ছেড়েছেন অন্তত ১৫ শিক্ষক। উচ্চশিক্ষার নামে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে শিক্ষকদের অনেকেই বিদেশে থিতু হচ্ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক সংকট ও আর্থিক ক্ষতিও দেখা দিয়েছে।

ছুটি শেষে অবশ্যই কর্মস্থলে ফিরবেন, নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষাছুটিতে যাওয়ার আগে প্রত্যেক শিক্ষককে এমন বন্ডে সই করতে হয়। এই শর্ত মেনেই তারা ছুটিকালীন বেতন-ভাতা ও বোনাস নেন। অথচ বাস্তবে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষাছুটিতে যাওয়া শিক্ষকদের বড় অংশই দেশে ফিরছেন না। ফলে বছর বছর এসব শিক্ষকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা টাকার পরিমাণও বাড়ছে। কিন্তু তা আদায়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধেও রয়েছে চরম উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষাছুটিতে থাকা অধিকাংশ শিক্ষক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পিএইচডি ও উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটের মধ্যে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ১৩ শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন, যা একটি বিভাগে সর্বোচ্চ। এরপরই রয়েছে অর্থনীতি বিভাগে, সেখানে শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন ৯ জন শিক্ষক।

এ ছাড়া ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স (ফিমস), অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এসিসিই), বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) এবং বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি (বিজিই) বিভাগের সাতজন করে, সিএসটিই, অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিক্স এবং বাংলা বিভাগে ছয়জন করে, ফার্মেসি

বিভাগ ও ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজিতে (আইআইটি) পাঁচজন করে, এমআইএস, ইংরেজি, ইএসডিএম, এফটিএনএস, ইইই এবং বিএমবি বিভাগে চারজন করে, পরিসংখ্যান বিভাগ ও আইআইএস ইনস্টিটিউটে তিনজন করে, সমাজবিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, আইসিই, শিক্ষা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগে দুজন করে এবং টিএইচএম, শিক্ষা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগে একজন করে শিক্ষক বর্তমানে শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিক্ষাছুটিতে থাকা ১২২ শিক্ষকের মধ্যে ২১ জন বেতন-ভাতা ছাড়া ছুটিতে রয়েছেন। আবার পিএইচডির জন্য নির্ধারিত ছুটির মেয়াদ শেষের পরও আট শিক্ষক এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেননি। তাদের মধ্যে একজনের বেতন বন্ধ থাকলেও বাকি সাতজন এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ভাতা সুবিধা পাচ্ছেন।

আরও জানা যায়, বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে নির্ধারিত সময় শেষে আর দেশে ফেরেননি অন্তত ১৫ শিক্ষক। পরবর্তীতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকেও অব্যাহতি নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নত গবেষণা পরিবেশ, উচ্চ বেতন-ভাতা, আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র এবং উন্নত জীবনমানের সুযোগ-সুবিধা অনেক শিক্ষককে বিদেশেই স্থায়ী হতে উৎসাহিত করছে।

পিএইচডি শেষে ফিরে না এসে চাকরি ছেড়ে দেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে সাতজনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মোট পাওনা ২ কোটি ১ লাখ ১৩ হাজার ৮২১ টাকা।

এই শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন ফিমস বিভাগের ড. আহসান হাবিব, কৃষি বিভাগের আবু বক্কর ছিদ্দিক, ফার্মেসি বিভাগের হাসানুজ্জামান, এসিসিই বিভাগের শহিদুল ইসলাম, বিজিই বিভাগের খাদিজাতুল কুবরা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জিনাত হোসেন ও মাইক্রোবায়োলজির মেহেদী হাসান চৌধুরী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষা অর্জন নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য জরুরি। তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক দীর্ঘ সময় শিক্ষাছুটিতে থাকায় এবং অনেকের ফিরে না আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ সংরক্ষণে আরও কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি করেছেন তারা।

এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার তামজিদ হোসাইন চৌধুরী বলেন, যেসব শিক্ষকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাওনা রয়েছে, তাদেরকে আমরা বারবার চিঠি দিচ্ছি। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। অনেক শিক্ষক চিঠি পাওয়ার পর পাওনা অর্থ ফেরত দিচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ৪২১ শিক্ষকের মধ্যে যদি ১২২ জনই শিক্ষাছুটিতে থাকেন, তাহলে অনেক বিভাগে শিক্ষক সংকট দেখা দেয় এবং কর্মরত শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বেড়ে যায়। আমরা এ বিষয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছি এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগও নিচ্ছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।