অবশেষে শেষ হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম শহরের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ। শুরুর দিকে তা ২০ বছর মেয়াদি হওয়ার কথা থাকলেও পরে ২৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ শেষ হচ্ছে। আর এই মাস্টারপ্ল্যানের ডিপিপি তৈরি থেকে শুরু করে অনুমোদন ও সার্ভে কাজ শেষে এখন অনুমোদন হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) পাঁচ চেয়ারম্যানের দেখা পেয়েছে।
২০১৫ সালে বিগত মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য ডিপিপি তৈরির কাজ শুরু করেন। ২০১৯ সালে ১০ বছরের মেয়াদ শেষে ছালামের বিদায়ের পর জহিরুল আলম দোভাষ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা মূলত এই দোভাষের সময়ই মাস্টারপ্ল্যানের প্রধান অংশের কাজ হয়ে থাকে। ২০২২ সালের জুনে ড্রোন সার্ভের মাধ্যমে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরুর পর ২০২৩ সালের ১৮ মে সার্ভে রিপোর্ট উপস্থাপন ও অনুমোদন হয়। এই সার্ভে রিপোর্টের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৬ মার্চ ইন্টেরিম রিপোর্টও উপস্থাপন ও অনুমোদন হয়ে যায়। এপ্রিলে দোভাষের মেয়াদ শেষ হলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ ইউনুস। এপ্রিলে দায়িত্ব পাওয়ার পর পরই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান প্রকৌশলী নুরুল করিম। এই চেয়ারম্যানের সময়কালে বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মিটিং ও মতামত গ্রহণের কাজটি হয়ে থাকে। এরই ভিত্তিতে গত বছরের ১৭ জুন ড্রাফট ফাইনাল রিপোর্ট-১ এবং গত ১ ফেব্রুয়ারিতে ড্রাফট ফাইনাল রিপোর্ট-২ উপস্থাপন ও অনুমোদন হয়। নুরুল করিমের বিদায়ের পর সম্প্রতি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। যেহেতু ড্রাফট ফাইনাল রিপোর্ট অনুমোদন হয়ে গেছে, তাই এখন খসড়া ফাইনাল রিপোর্ট জনগণের সামনে উপস্থাপন হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে গতকাল এই খসড়া রিপোর্ট সিডিএ তাদের ওয়েবসাইটে আপলোডও করেছে। এখন আগামী ২ মাস এই খসড়া রিপোর্টের ওপর মতামত সংগ্রহের পর ডিসেম্বরে ফাইনাল রিপোর্ট প্রকাশ করবে সিডিএ। বিগত চার চেয়ারম্যান মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে কাজ করলেও তাদের হাতে শেষ হতে পারেনি। কিন্তু নিজের হাতে শেষ হওয়াকে কীভাবে দেখছেন এবং তা বাস্তবায়নে কতটুকু সতর্ক থাকবেন সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের কাছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়েছে। এখন আর সেদিন নেই। সিডিএর চলমান মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামীতে একটি দেয়ালের গাঁথুনি হলেও তা হতে হবে মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে। নগরীর প্রধান সড়কের পাশে যারা অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করেছেন; সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ের চেয়ারম্যানদের হাতে এই মাস্টারপ্ল্যান শেষ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে সুযোগ দিয়েছেন চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত ও নান্দনিক সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করার জন্য। আমি শতভাগ চেষ্টা করব মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে নগরীর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।
২ মাস চলবে মতামত গ্রহণ : মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া রিপোর্ট ইতিমধ্যে সিডিএ ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। এখন পরবর্তী কাজ কি জানতে চাইলে মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারী বলেন, ‘আগামী ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগরবাসীর কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করব। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গেও আমরা বসব। সবার মতামতের ভিত্তিতে আগামী ডিসেম্বরে ফাইনাল রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।’ কিন্তু এই মতামত কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওয়েবসাইটে থাকা লিংকের মাধ্যমে যে কেউ মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মতামত দিতে পারবে। আবার সিডিএ অফিসে এসেও নির্ধারিত ডেস্কে মতামত দিতে পারবে।
এদিকে এই মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘এক্ষেত্রে যারা মতামত দেবে তাদের আগে মাস্টারপ্ল্যান সম্পর্কে জানতে হবে। তারা জানতে হলে এলাকায় এলাকায় গিয়ে এবং বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে মিটিং করে অবহিত করতে হবে। আর তবেই তাদের কাছ থেকে ভালো ফিডব্যাক আসবে এবং মাস্টারপ্ল্যানটি জনবান্ধব হবে।’
বিশেষজ্ঞ মতামত : এবারের মাস্টারপ্ল্যানটি একটি ব্যতিক্রমী মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, ‘এবারই প্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের পর তৃতীয় একটি ফার্ম বা সংস্থা দিয়ে তা ভেটিং করা হচ্ছে। এই মাস্টারপ্ল্যানটি ভেটিং করছে চুয়েট। চুয়েটের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাশাপাশি প্রয়োজনে বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ এনে এই মাস্টারপ্ল্যান ক্রসচেক করা হচ্ছে, যা একটি ভালো উদ্যোগ। একই সঙ্গে আগামী দুমাস নাগরিকদের কাছ থেকে মতামত নেওয়াও একটি ভালো মাস্টারপ্ল্যানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমরা আশা করছি, এবার একটি জনবান্ধব মাস্টারপ্ল্যান পেতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম।’
চট্টগ্রামের যত মাস্টারপ্ল্যান : উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সেই মাস্টারপ্ল্যানের গাইড লাইনের আলোকে ১৯৬৫ সালে একটি রিভিও প্ল্যান হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে মাস্টারপ্ল্যান হয়েছিল ২০ বছর মেয়াদি। এই মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে ২০০৮ সালে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন হয়। সেই ড্যাপের আলোকেই মূলত এই চট্টগ্রাম শহরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে আসছিল। ২০১৫ সালে সেই মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো মাস্টারপ্ল্যান না হলেও এখনো ড্যাপের গাইডলাইন অনুসারে চলছে সিডিএর কার্যক্রম।
উল্লেখ্য, একটি নগরীর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ নির্ধারণ হয়ে থাকে মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে।