বাংলার ইতিহাসের প্রতিটি সংকটময় বাঁকে কিছু আলোকবর্তিকা পথ দেখিয়েছেন জাতিকে। সেই আলোর মিছিলে অগ্রগণ্য দুটি নাম কবি সুফিয়া কামাল ও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। একজন কলমে জাগিয়েছেন মানবতা, সাহস ও প্রতিবাদের চেতনা; অন্যজন মাতৃহৃদয়ের গভীর বেদনা বুকে ধারণ করে হয়ে উঠেছেন মুক্তিযুদ্ধের অমর প্রেরণা। তাদের জীবন যেন সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের এক অনিঃশেষ মহাকাব্য। সেই দুই মহীয়সী জননীর স্মৃতি, আদর্শ ও বীরত্বগাথাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
‘তাঁদের সংগ্রামের বীরগাথা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে কাব্য, সংগীত, নৃত্য ও স্মৃতিকথনের সঙ্গে উঠে আসে তাদের জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলো, যেখানে ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম মিশে গেছে জাতির মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ছিল এই স্মরণালেখ্য।
অনুষ্ঠানে কবি সুফিয়া কামাল ও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আত্মকথন, ডায়েরির পাতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বীরত্বপূর্ণ দিনগুলোর কথা বাচিক ও গীতি-আলেখ্যে তুলে ধরা হয়।
সূচনায় প্রদর্শন করা হয় ভিডিওচিত্র। এরপর পরিবেশিত হয় সংগীত ‘তোমার এই খেলা ঘরে শিশুকাল কাটিল রে’। গানের পর একে একে তুলে ধরা হয় সুফিয়া কামাল ও জাহানারা ইমামের বাল্যজীবন থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা জীবনের গল্প।
তাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ-ভারতে বাঙালির জাতি রাষ্ট্র গঠনের যে প্রয়াস শুরু হয়, তাও উঠে আসে একে একে। পশ্চাৎপদ সমাজে সামাজিক বাধার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুফিয়া কামালের বাল্যবিবাহ ও পরবর্তী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সংগ্রাম এবং জাহানারা ইমামের সিভিলিয়ান জীবন থেকে সুশিক্ষিত হয়ে ওঠার গল্প উঠে আসে প্রথম ভাগে।
কথামালার ফাঁকে ফাঁকে পরিবেশিত হয় জাগরণের গান। এই পর্বে ছিল ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ ও ‘অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ’ গানের পরিবেশনা।
১৯৪৬ সালের কলকাতা দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর দেশভাগ ও ঢাকায় এসে এতিমখানায় কাজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণের পাশাপাশি বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ উদযাপন প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত উঠে আসে সংগীত ও কথামালায়। পরিবেশিত হয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ও ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’-র মতো কালজয়ী গান।
কালক্রমে আসে একাত্তরের উত্তাল মার্চ, ২৫ মার্চের কালরাত। রুমিকে যুদ্ধে পাঠানোর আবেগঘন সিদ্ধান্ত এবং ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা যুদ্ধের অগ্নিঝরা দিন তুলে ধরা হয় জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে। অন্যদিকে কবি সুফিয়া কামালের ধানম-ির বাসভবনে অবরুদ্ধ দিন, সেনা নজরদারি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহায়তা করার লোমহর্ষক ইতিহাসও উঠে আসে স্মৃতিকথন থেকে।
পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথের গান, সুফিয়া কামালের লেখা কবিতা, অবরুদ্ধ স্বদেশের বন্দিদশার কাব্যরূপ এবং একাত্তরের ডায়েরি থেকে আবৃত্তি দর্শক-শ্রোতাদের আবেগে আপ্লুত করে। বিজয়ের রক্তিম সূর্য উদয়ের পর ১৬ ডিসেম্বরের স্মৃতিচারণ এবং ‘ঐ পোহাইলো তিমির রাতি’ গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই স্মৃতিজাগানিয়া ও ভাবগম্ভীর আয়োজন।
অনুষ্ঠানে ঘোষিত কোনো অতিথি না থাকলেও দর্শক সারিতে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিত লক্ষ করা গেছে।