ইতিহাস যেন ভুলে না যাই

২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম দিন থেকে ঢাকার মতো সরব ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সমগ্র চট্টগ্রামে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়ায়। পুলিশের বুলেট, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হামলা দমাতে পারেনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে। বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে ১ জুলাই গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর প্রতিবাদ, জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর চূড়ান্ত মুহূর্তে লাখ-জনতার প্রতিবাদে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীরা প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে অবস্থান নিলেও, সময়ের প্রয়োজনে চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারের প্রতি সড়কে স্থানান্তর হয়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায় সাধারণ জনগণ। শুরু হয় তীব্র প্রতিরোধ। সড়ক-রেলপথ অবরোধে শুরু হয় স্বৈরাচার পতনের চূড়ান্ত ধাপ।  গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী শহীদ হন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও মো. ফরহাদ হোসেন। হৃদয় চন্দ্র তরুয়ার বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায়। বাবা রতন চন্দ্র তরুয়া একজন কাঠমিস্ত্রি। ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে গিয়ে সে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে গুলিবিদ্ধ হন। পরে ২৩ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীন হন। আর শহীদ ফরহাদ হোসেন ছিলেন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। নিজ এলাকা মাগুরায় ৪ আগস্ট সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে গিয়ে শহীদ হন। পরিবারে চার ভাইবোনের মধ্যে, সবার ছোট ছিলেন ফরহাদ। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী আহত হন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে জুলাই-২৪’র ১ জুন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গুটিকয়েকজন নিয়ে শুরু হলেও, সপ্তাহ না পেরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব শিক্ষার্থীর প্রাণের আন্দোলনে পরিণত হয়। ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘সকল কোটা বাতিল হোক, যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি হোক’ স্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার, একাডেমিক ভবন, জিরো পয়েন্টে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জারি রাখেন শিক্ষার্থীরা। ৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে বড়সড় প্রতিবাদ করে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারে ৯ জুন বিক্ষোভ করে কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে শত শত শিক্ষার্থী। ওই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনারের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া কোটাব্যবস্থা পুনর্বহালের এ রায় বাতিল করা না হলে তারা কঠোর আন্দোলনে যাবে। একপর্যায়ে ১১ জুলাই  শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের পর উত্তাল হয় চট্টগ্রাম। পরদিন ১২ জুলাই পুলিশি হামলার প্রতিবাদে, চট্টগ্রামে হাজারো শিক্ষার্থীর মিছিলে অচল হয় বন্দরনগরীর রাজপথ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাড়াও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে চট্টগ্রাম কলেজ, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সরব অংশ করে। ১২ জুলাই আন্দোলনে প্রায় ১০ হাজার ছাত্র-জনতা অংশ নেন। ১৩ ও ১৪ জুলাই শহরের কর্মসূচিতে হাজার হাজার জনতা অংশ নেয়। ১৪ জুলাই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ। সেদিন শহরে আন্দোলন করে শাটল ট্রেনে ক্যাম্পাসে ফিরে ছাত্রলীগের বাধায় পড়ে আন্দোলনকারীরা। রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করলে, ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ করে। আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা। ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের তুলে নিয়ে যায় তারা। তাদের হামলায় শিক্ষার্থীরা রক্তাক্ত হন। এটাই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম রক্তপাত। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী।

২০২৪-এর ১৫ জুলাই, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার পর দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে ছাত্রদল কর্মী ওয়াসিম, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ কয়েকজন শহীদ হন। এরপর থেকে আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তন হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালেয়ের শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে থাকেননি। আন্দোলনের পরিধি দেখে, স্বৈরাচার হাসিনা সরকার প্রতিটি ক্যাম্পাস বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। সরকারের এ ঘোষণায় কর্ণপাত করেনি শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থীও বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে বের হতে চায়নি। তখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন জোরপূর্বক শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য আবাসিক হল বন্ধের ঘোষণা দেয় ১৭ জুলাই। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ছাত্রী ও রাত ১০টার মধ্যে ছাত্রদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেদিন  দেশে দূরপাল্লার গাড়ি বন্ধ ছিল। সন্ধ্যা ৬টায়, বিশেষ করে ছাত্রীরা আবাসিক হল ছেড়ে কীভাবে বাড়ি যাবে? প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থীরা লালকার্ড দেখায়। একজন শিক্ষার্থীও হল থেকে বের হতে চায় না। তখন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায় কিছু শিক্ষক। আন্দোলনকারীদের নানাভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ান হৃদয়বান শিক্ষকরা। তাদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান শিক্ষকরা। অনেক শিক্ষার্থীকে নিজ বাসায় আশ্রয় দেন তারা।

১৮ জুলাইয়ের পর উৎকণ্ঠার সঙ্গে দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে দেশের মানুষের সময়গুলো পার করতে হয় দুশ্চিন্তায়। কারণ সব শিক্ষককে টার্গেট করে ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় স্বৈরাচারের দোসররা। হামলার পর, পরিবার-পরিজন নিয়ে শিক্ষকরা প্রতিটি ক্ষণ অতিবাহিত করেন উৎকণ্ঠায়। একসময় বিপ্লবের রক্তধারার বিনিময়ে আসে ৩৬ জুলাই। অসংখ্য শহীদ ও আহতের ত্যাগের বিনিময়ে ৫ আগস্ট দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়। প্রতিনিয়ত আমরা তাদের স্মরণ করব শ্রদ্ধাভরে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ ও সাহসে সেদিন শহরের মানুষ উজ্জীবিত হয়েছিলেন। শহীদদের রক্ত স্ফুলিঙ্গ হয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় দেশ। পতন হয় দীর্ঘ সময়ের স্বৈরাচারের। রাজনীতিতে আসে গণতান্ত্রিক আবহ।

লেখক : উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

prof.alamin@gmail.com