ঘরের এক কোণে কিছু ব্যবহৃত জিনিসে ধুলো জমছে। দুই বছর ধরে ওগুলোতে আর কারও হাত পড়েনি। আলমারির ওপরে প্যাকেটে ভাঁজ করে রাখা কয়েক সেট জামাকাপড়, সেগুলোও আর কোনোদিন পরা হবে না। পড়ার টেবিলের পাশে স্তব্ধ হয়ে আছে প্রিয় বইগুলো; দেয়ালে ঝুলে আছে স্কুল থেকে পাওয়া মেডেল আর স্মারক। পাশেই ব্যাডমিন্টন র্যাকেট। একপাশে ফ্রেমে বাঁধানো, পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া এক কিশোরের চিরসবুজ হাসিমুখ। ঘরের প্রতিটি কোণে এখনো ‘জীবন্ত’ ১৭ বছরের কিশোর মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্মৃতি (ফারহান ফাইয়াজ)। তার বেড়ে ওঠা, তাকে ঘিরে বাবা-মায়ের বুনে রাখা শত শত স্বপ্ন মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয়েছে, তা কোনো প্রাপ্তির বিনিময়েও পূরণ হওয়ার নয়।
সন্তান হারানোর বেদনার কথাই জানালেন ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাকায় প্রথম শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পরিবার। রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইয়াজ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ১৮ জুলাই রাজপথে নেমে ধানম-িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। দুই বছর পেরিয়ে গেছে, তবু হত্যার বিচার মেলেনি। তাই কোনো প্রাপ্তিই সন্তানের শূন্যতায় শোকাহত পরিবারটির বেদনা লাঘব করতে পারেনি। আদৌ পারবে কিনা, সন্দিহান পরিবার।
ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফাইয়াজের সেদিন আন্দোলনে যাওয়ার কথা ছিল না। এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ওর দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। কোটা সংস্কার নিয়ে ওর চিন্তাই ছিল না। কিন্তু ওই আন্দোলনে ওর ক্যাম্পাসের বড় ভাইদের ওপর হামলা, মারধর, গুলিবর্ষণের যে ঘটনা ঘটছিল তা ও মেনে নিতে পারেনি। তাই এমন অন্যায় হামলার প্রতিবাদ করতে ফাইয়াজ সেদিন রাজপথে নামে এবং নিহত হয়। ওর মৃত্যুর পর আমাদের একটাই চাওয়া ছিল সন্তান হত্যার বিচার । কিন্তু বিচার পাওয়া নিয়ে কীভাবে আশাবাদী হবো? দুই বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার হয়নি।’ তিনি উল্টো প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এ দেশে কোনো হত্যার বিচার হয়েছে? এত বছরেও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার বিচার হয়নি। আমার সন্তানকে হত্যার বিচার আদৌ পাব কি? তারপরও তার সবচেয়ে বড় আশা, যারা তার ছেলেকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের বিচার নিশ্চিত হোক এবং শহীদদের আত্মত্যাগ রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয় না হয়ে জাতীয় মর্যাদার অংশ হিসেবে মূল্যায়িত হয়।’
ফারহান ফাইয়াজকে হারানোর বেদনা কোনো সম্মাননা বা স্বীকৃতিতে মুছে যাওয়ার নয়। তবু গত দুই বছরে রাষ্ট্র ও সমাজের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগকে পরিবারের সদস্যরা সন্তানের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। যেখানে ফাইয়াজ গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, সেই ধানম-ির পুরনো ২৭ নম্বর সড়কের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ সড়ক’ রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন একটি খেলার মাঠের নামও ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ খেলার মাঠ’ রাখা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে বরপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ বরপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এ ছাড়া ফারহানের স্মরণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা ও ক্রীড়া আয়োজন হয়েছে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে তার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘সন্তানের নামে একটি সড়ক বা স্মারক গড়ে ওঠা গর্বের বিষয়, কিন্তু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে না। আমার রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদানের দরকার নেই। আমি ছেলের নামে ফাউন্ডেশন করেছি। আল্লাহর রহমতে আজীবন ফাউন্ডেশনে অনুদান করে যাব। রাষ্ট্রের কাছে শুধু চাওয়া, আমার সন্তান হত্যার বিচার যাতে করা হয়।’
ফাইয়াজ তার পরিবারের সঙ্গে রাজধানীতে থাকত। শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া ও ফারহানা দিবা দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে সে ছিল বড়। ছোট বোন সায়ীমা ইসলাম ফারিন বর্তমানে অনার্সের শিক্ষার্থী। সময় কেবল দিন-তারিখ বদলালেও ফাইয়াজের শূন্যতা দুই বছরে একটুও কমেনি পরিবারের কাছে। ঘরের প্রতিটি কোণ, পড়ার টেবিল, বইয়ের তাক, পুরনো পোশাক, সবকিছুতেই যেন ছড়িয়ে আছে ছেলের উপস্থিতি। প্রতিদিনের জীবনে অসংখ্য মুহূর্তে তারা অনুভব করেন, কেউ একজন নেই; যে ছিল তাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ফাইয়াজের বাবা বলেন, ছেলেটা গবেষক হতে চাইত। বিদেশ গিয়ে ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে এসে গবেষণা করার আকাক্সক্ষা ছিল। আমি প্রথমে দেশের বাইরে পাঠাতে রাজি ছিলাম না। কিন্তু পরে রাজি হই এবং ওকে সম্মতি দেই। সেই লক্ষ্যেই ছেলেটা পড়ালেখা করত, আমরাও ওকে সেভাবে গড়ে তুলছিলাম। কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ওর অনুপস্থিতি পরিবারের জীবনধারাই বদলে দিয়েছে। উৎসব, জন্মদিন কিংবা পারিবারিক যেকোনো আনন্দের আয়োজন এখন আর আগের মতো হয় না। জুলাই মাস এলেই সেই বেদনা আরও গভীর হয়ে ওঠে; আমাদের কাছে এটি শুধু একটি মাস নয় বরং এক চিরস্থায়ী শোকের স্মারক। ছেলেকে হারানোর পর থেকে ওর মা বাকশক্তিহীন। কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। ওর একমাত্র বোন এখনো ট্রমালাইজড। শুধু ওর ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে আর নিজে নিজে কাঁদে। আমরা কেউ দুই বছরেও ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এখনো দিনগুলো ওর শোকে কাটে। আল্লাহ যেন জান্নাতে আমার ছেলেটাকে আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে রাখেন, নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সেই নসিহৎ করে দিন কাটছে আমাদের।
গত ১৮ জুলাই ফাইয়াজের স্মরণে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ মিলনায়তনে স্মরণসভার আয়োজন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। স্মরণ সভায় ফাইয়াজের ব্যাচমেটরাও অংশ নেয়। তারা এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ফাইয়াজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বন্ধুরা। বেঁচে থাকলে ফাইয়াজও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করত। ফাইয়াজের তৎকালীন শ্রেণিশিক্ষক নজরুল ইসলাম তার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে সরকারের কাছে দাবি জানান, ‘ফাইয়াজ এই কলেজের নক্ষত্র এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাকে হত্যার পেছনে যারা দায়ী, তাদের যেন দ্রুত বিচার করা হয়।’