হার্দিক পান্ডিয়ার ‘ভাই’ অস্ট্রেলিয়া দলে, সামনে বাংলাদেশ!

অস্ট্রেলিয়া সফরে দুই টেস্টের সিরিজে মাঠে নামার আগে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ। ডারউইনে মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে 'ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশে'র বিপক্ষে তিন দিনের সেই ম্যাচটি শুরু হবে ৬ আগস্ট। এই ম্যাচেই মাঠে নামার অপেক্ষায় এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত ২৪ বছর বয়সী বাঁহাতি স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার জারসিস ওয়াদিয়া।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে অধিকাংশ খেলোয়াড়ের উঠে আসার পথটা বেশ সাধারণ—অনূর্ধ্ব পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বমূলক ক্রিকেট খেলা, পারফর্ম করে নজর কাড়া এবং সেখান থেকে মূল দলে সুযোগ পাওয়া। কিন্তু 'ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ'-এর সদস্য জারসিস ওয়াদিয়ার গল্পটা আর দশটা সাধারণ গল্পের মতো নয়।

বলিউড অভিনেতার সন্তান, পরিবারে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী সদস্য এবং হার্দিক-ক্রুনাল পান্ডিয়ার সাথে পারিবারিক সম্পর্কের অনন্য পটভূমি নিয়ে অ্যাডিলেডে নিজের নতুন জীবন শুরু করেছেন এই তরুণ ক্রিকেটার।

গত মৌসুমে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের হয়ে বিগ ব্যাশ লিগে অভিষেক ঘটে জারসিসের। দ্বিতীয় বিবিএল ম্যাচে ব্রিসবেন হিটের বিপক্ষে নেমেই প্রথম তিন বলে হাঁকান তিনটি ছক্কা! সেই এক ইনিংসেই তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি।

সেই রাতারাতি পরিচিতি পাওয়া নিয়ে জারসিস স্মরণ করেন, "ওই বিধ্বংসী ইনিংসের পর সংবাদমাধ্যমের আলোচনা আর আগ্রহ একলাফে তুঙ্গে পৌঁছে যায়। শুরুর দিকে বিষয়টা সামলানো একটু কঠিনই ছিল, তবে আমার মনে হয় ভারতীয় ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা এই আলাদা গল্পটাই সবার নজর কেড়েছে।"

পারিবারিক ঐতিহ্য: বলিউড, গিনেস রেকর্ড ও পান্ডিয়া ভ্রাতৃদ্বয়

জারসিসের ক্রিকেটপ্রেমের পেছনে রয়েছে তার পারিবারিক প্রভাব। তার বাবা দিলজান ওয়াদিয়া একজন বলিউড অভিনেতা, আর তার দাদা নেভিল ওয়াদিয়া সবচেয়ে বয়সী হিসেবে মাইনর ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী। জারসিসের ভেতরে ক্রিকেটের বীজটি বুনে দিয়েছিলেন তার দাদাই, "আমার দাদা আমাকে ক্রিকেটার হিসেবে দেখতে ভীষণ উদগ্রীব ছিলেন। খুব ছোট থাকায় বাবা-মা চাকরি সামলে আমাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতে পারতেন না। তাই মুম্বাই থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে দাদা-দাদির কাছে থাকতে শুরু করি। আমার জুনিয়র ও শৈশবের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে তার অবদান অপরিসীম।"

দাদা-দাদির সাথে থাকার সময়ই জারসিসের পরিচয় হয় ভারতের বর্তমান তারকা অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়া ও ক্রুনাল পান্ডিয়ার সাথে। পান্ডিয়া পরিবারের সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ে তিনি বলেন, "হার্দিক ও ক্রুনাল যখন ছোট ছিল, তখন আমার পরিবার ওদের পড়াশোনায় সাহায্য করেছিল। সেখান থেকেই আমাদের সম্পর্কের সূচনা। আমার বাবা, হার্দিক ও ক্রুনাল একসাথে ক্রিকেট খেলত, যা আমাদের মধ্যকার পারিবারিক বন্ধন আরও মজবুত করে। হার্দিক যখন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে আইপিএলে প্রথম সুযোগ পায়, তখন মুম্বাইয়ে ওর থাকার মতো কোনো জায়গা ছিল না। সে সময় সে আমার বাবা-মার কাছেই থাকত। সিএ একাদশ দলে সুযোগ পাওয়ার পর এবং বিগ ব্যাশে অভিষেকের পর হার্দিক ও ক্রুনাল দুজনই আমাকে টেক্সট করেছিল। বিশ্বসেরা পর্যায়ে দাপট দেখিয়েও তারা যেভাবে বিনয়ী থেকে আমাকে গাইড করে, তা সত্যিই দারুণ। সবার তো আর এমন ভারতীয় তারকাদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয় না, ওরা তো ওখানে রিয়েল রকস্টার!"

কোভিডের ধাক্কা ও ১০,০০০ কিলোমিটার দূরের অ্যাডিলেডে যাত্রা

ভারতে যখন জারসিসের ক্রিকেটিং ক্যারিয়ার গ্রাফ ওপরের দিকে উঠছিল, তখনই ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে হানা দেয় কোভিড মহামারি। ভারতে অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকে বাদ পড়া এবং জুনিয়র স্টেট ক্রিকেট স্থগিত হয়ে যাওয়া তার ক্যারিয়ারকে এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। সে সময়ের কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে জারসিস বলেন, "কোভিডের কারণে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার সুযোগ হাতছাড়া হয়, তারপর জুনিয়র স্টেট ক্রিকেটও বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে সুযোগ না পেলে মূল সিস্টেমে ঢোকা কতটা কঠিন, তা সবাই জানে।"

জারসিস বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে

২০১৯ সালে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন জারসিস। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ২০২০ সালে পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই থেকে প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার দূরে অ্যাডিলেডে পাড়ি জমান তিনি, "কেন জানি না, আমার মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াই আমার জন্য সঠিক জায়গা। আমার বাবা-মা সিদ্ধান্তটাকে অদ্ভুত ভেবেছিলেন, কিন্তু আমার নিজের ওপর জেদ ছিল আর দাদা আমার ওপর গভীর বিশ্বাস রেখেছিলেন।"

স্বপ্নপূরণের পথে নিখিল চৌধুরীর অনুপ্রেরণা

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার ক্রিকেটে চার মৌসুম খেলার পর গত বছর 'টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি' টুর্নামেন্টে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স একাডেমির হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন তিনি। এর পরপরই ডিসেম্বর মাসে বিবিএলে স্ট্রাইকার্সের মূল দলে অভিষেক হয় তার। অস্ট্রেলিয়ার বয়সভিত্তিক ক্রিকেট না খেললেও কিভাবে এগোতে হবে, সে বিষয়ে তার মনে সবসময় স্পষ্ট ধারণা ছিল। আর এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে বড় ভূমিকা রাখেন হোবার্ট হারিকেনসের ভারতীয় বংশোদ্ভূত অলরাউন্ডার নিখিল চৌধুরী।

জারসিস বলেন, "অনূর্ধ্ব-১৭ বা অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় থেকে না এলেও, পেশাদার ক্রিকেট ও বিগ ব্যাশে পৌঁছানোর জন্য আমার মাথায় একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ ছিল। দুই বছর আগে নিখিলকে যখন প্রথম হারিকেনসের হয়ে খেলতে দেখলাম, তখন মনে হয়েছিল—'হ্যাঁ, এই পথেও সাফল্য পাওয়া সম্ভব!' এরপর সে যখন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে সুযোগ পেল, আমার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। নিখিল পারলে, কঠোর পরিশ্রম করলে আমিও পারব—এই বিশ্বাসটা এখন আমার ভেতরে স্পষ্ট।"

বাংলাদেশের বিপক্ষে ডারউইনে 'ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ'-এর হয়ে মাঠে নামার আগে জারসিস জানেন, এবার প্রতিপক্ষ দলগুলো তার ব্যাটিং নিয়ে বাড়তি পরিকল্পনা করেই মাঠে নামবে।

বাহাতি ব্যাটার জারসিস

আসন্ন মৌসুমের লক্ষ্য ও নিজের স্বপ্ন নিয়ে জারসিস বলেন, "এখন সবাই আমার খেলা সম্পর্কে জানে, আমার শক্তির জায়গাগুলো তারা অ্যানালাইসিস করবে। সেই চ্যালেঞ্জ উৎরে ওপরে ওঠাই এখন আমার কাজ।

আমার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্সের হয়ে বিগ ব্যাশ শিরোপা জেতা। এছাড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সুযোগ পেয়ে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শেফিল্ড শিল্ড খেলাও আমার বড় লক্ষ্য। সাউথ অস্ট্রেলিয়া টানা দুইবারের শিল্ড চ্যাম্পিয়ন, তাই দলে জায়গা করে নেওয়া কঠিন হবে। তবে সুযোগ পেলে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আমি।

আর সবশেষে, আমার চূড়ান্ত স্বপ্ন হলো অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা। এই সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার জন্যই তো ১০,০০০ কিলোমিটার দূরে এখানে এসেছিলাম।"