বিদেশি সহায়তা বা উন্নয়ন অংশীদারদের ওপর নির্ভরশীলতা নয়; বরং নীতিগত স্বাধীনতাই একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের মূল শর্ত বলে মন্তব্য করেছেন ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, বিদেশি সহায়তা নেওয়া সমস্যা নয়, সমস্যা তখনই হয়, যখন একটি দেশ নিজের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। যেসব দেশ নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী নীতি প্রণয়ন করতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়েছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত ‘উন্নয়ন কৌশল ও নীতিগত স্বাধীনতা : বাংলাদেশের উন্নয়ন পথপরিক্রমা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্সের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সহসভাপতি মো. রেজওয়ান সেলিম।
আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য নীতিগত স্বাধীনতা অপরিহার্য। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গৃহীত বেসরকারীকরণ উদ্যোগ, তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের উত্থান এবং কৃষি খাতের সংহতকরণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত হয়ে এসেছে এবং অগ্রাধিকারের পরিবর্তে বহিঃস্থ চাপের প্রভাবে সংস্কার-কার্যক্রম ক্রমবর্ধমানভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত দেশটি বিপুল পরিমাণ মার্কিন সহায়তা পেয়েছিল। কিন্তু নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা কখনো বাইরের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করেনি। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করলেও নিজেদের সিদ্ধান্তে বুসান থেকে সিউল পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে, যা পরবর্তী শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি করে। এটাই প্রকৃত নীতিগত স্বাধীনতার উদাহরণ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহার এবং সাম্প্রতিক বাজেটে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথরেখা ও সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন এখন জরুরি। নীতি স্বাধীনতার ক্ষেত্রে কেবল বহির্বিশ্ব নয়, দেশের অভ্যন্তরের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে প্রভাবশালী গোষ্ঠী, আমলাতন্ত্র এবং সরকারের আনুকূল্যে গড়ে ওঠা এক শ্রেণির ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে অশুভ আঁতাত বা নেক্সাস তৈরি হয়েছিল, তা সঠিক নীতিমালা প্রণয়নে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। দেশের আপামর জনস্বার্থ রক্ষা করতে হলে এই বিশেষ গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব কাটিয়ে উঠে শক্তিশালী সংস্কারের দিকে এগোতে হবে।
ড. সেলিম রায়হান উন্নয়নের সক্ষমতা প্রশ্নে ভিয়েতনামের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশটির রপ্তানি আয়, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এবং মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত পরিকল্পিত। ভিয়েতনাম অনেকটা সেই শিক্ষার্থীর মতো, যে পরীক্ষার সব প্রস্তুতি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ভালো করলেও সামগ্রিক সক্ষমতা অর্জনে এখনো পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বা নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ সামনে এলে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই খাপ খাওয়াতে পারছে না। এই সক্ষমতার অভাব কেন এতদিনেও দূর হলো না, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখেন তিনি।