দেশের চলমান জ্বালানি সংকট সহসা যাচ্ছে না। তাই বিকেন্দ্রীভূত বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ইউনিটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। কিন্তু এই সৌরবিদ্যুৎ ঘিরে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে তা কাটাতে হলে ব্যাপকভাবে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
গতকাল রবিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে এক কর্মশালায় বক্তারা নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, দেশে চলমান জ্বালানি সংকট, গ্যাসের ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটাতে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। ইআরএফ এবং ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউয়েবল এনার্জি প্ল্যাটফর্ম (ডিআরইপি) যৌথভাবে ওই কর্মশালার আয়োজন করে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সেমিনারে বলেন, জ¦ালানির যে সংকট তৈরি হয়েছে তা সহসা যাবে না। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দেওয়ার এখনই সময়।
তিনি বলেন, শিল্প-কারখানা ও বাসগৃহের ছাদে বা গ্রামে ঘরে ঘরে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনে উৎসাহিত করতে হলে কর-শুল্ক ছাড়, স্বল্প সুদে অর্থায়ন এবং উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ স্টোরেজ করে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। একইসঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ৪ কোটি ৩ লাখ ৬০ হাজারখানা বা হাউজহোল্ড (আবাসগৃহ) রয়েছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ যদি বিকেন্দ্রিয়ায়িত বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ইউনিটে সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করে তাহলে ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি থেকে এলে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। সেইসঙ্গে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ শিল্পে ব্যবহার করা যাবে।
সেমিনারে জানানো হয়, বিদ্যমান সোলার হোম সিস্টেমের মধ্যে ৬০ শতাংশ বিকল হয়ে পড়ে আছে। নিয়মিত মেইনটেন্যান্স না করা এবং দুর্বল ও নিম্নমানের প্যানেল দিয়ে সোলার হোম সিস্টেম করাকে এ জন্য দায়ী করা হয়। তবে, গ্রামের লোকজনের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে, সোলার প্যানেল টেকসই হয় না। তাই নতুনরা এতে আগ্রহ দেখায় না।
সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. মেহেদী হাসান শামীম বলেন, আমরা ২০২৫ সালের একটা জরিপ করেছিলাম, সেখানে দেখেছি ৪৫ শতাংশ সোলার নন ফাংশন হয়ে আছে। রুফটপ সোলার ফাংশন করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নেট মিটারিংয়ের আবেদন করার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর জোর দেন তিনি।
সেমিনারে প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতে সামাজিক আন্দোলন করে সম্প্রসারিত টিকাদান ও খাল খনন কর্মসূচি সফল হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার যে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং কমপক্ষে ২০ বছর ধরে চলে তা ঘরে ঘরে গিয়ে বুঝাতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) চেষ্টা করলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার উৎসাহিত করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে।
সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনে অর্থায়ন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, দেশে সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক হলো এনজিওদের। আমি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের একটা প্রোগ্রামে যাব এবং তাদের আহ্বান জানাব যেন এই খাতে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ করেন তারা।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) কোম্পানি সেক্রেটারি এ এস এম মুনির বলেন, সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যাটফর্মের জন্য অনেক ইকোসিস্টেম জড়িত। আমদানিকারক, প্রস্তুতকারক, বিতরণসহ নানা বিষয় জড়িত। আমরা চাই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুমোদন না নিয়ে যেকোনো একটি জায়গা থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অ্যাকশন এইডের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন বিভাগের ব্যবস্থাপক আবুল আজাদ, সোলশেয়ার পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ, কোস্টাল লাইভলিহোড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন) এর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হাসান মেহেদী, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।