ঢাকার চারপাশে ওয়াটার বাস

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ শুধু মানুষের জীবনকেই গড়ে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না, রাষ্ট্র-সমাজ এবং পারিপার্শ্বিকতায়ও এর কল্যাণকর প্রভাব ফেলে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে যতটা অগ্রগামী, বাস্তবায়ন কিংবা কার্যকরের ব্যাপারে ততটা পারঙ্গম নই, এর বহু নজির আছে। যে সিদ্ধান্তটা কঠিন মনে হয়, সেটাই সঠিক হবে, এমন ধারণার কথা জনপরিসরে কখনো কখনো শোনা যায়। এই গৌরচন্দ্রিকার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে সরকারের একটি সিদ্ধান্ত। ৩ আগস্ট দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশে চক্রাকার নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে ওয়াটার বাস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সভায় ঢাকার নদীগুলোর দূষণ প্রতিরোধ, নদীর নাব্য ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীতীরে হাঁটার পথের পাশে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণসহ আরও কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।

ঢাকার যানজট নিরসনে ক্রমাগত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নেওয়া হলেও এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে না। ঢাকার মানুষের কর্মঘণ্টার ক্ষয় ঘটছে রাস্তায় এবং এই ঝরে পড়া কর্মহীন সময়ের অপচয়ের ক্ষতি বহুমাত্রিক। আমরা জানি, ঢাকা কিংবা ঢাকার আশপাশে তো বটেই, সারা দেশেই নানা কারণে নৌপথ অনেক সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সিংহভাগ নদ-নদীতে পড়েছে দখলের থাবা। দূষণের মাত্রাও উদ্বেগজনক। অনেক নদ-নদী হারিয়েছে নাব্য। ঢাকার নদীগুলোও এর বাইরে নয়। নদীর তীরে নির্মিত ওয়াকওয়ের পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে শুধু যে পরিবেশের সুরক্ষাই  নিশ্চিত হবে তা-ই নয়, নদীর তীরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের  স্মরণে আছে, অতীতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ঢাকায় চক্রাকার নৌপথ চালু করেছিল। কিন্তু লোকসানের কারণে তা দীর্ঘায়ু পায়নি। আমরা মনে করি, মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনব্যবস্থায় জোর দেওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে কাজে লাগানো যেত পর্যটনের সম্ভাবনাও। পর্যটন এখন শুধু বিনোদনই নয়, শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্যরও অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

বিআইডব্লিউটিসি যে ব্যবস্থা চালু করেছিল তা সুচারু ছিল না। দেখা গেছে, সড়কপথের তুলনায় নদীপথে গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগছে এবং এর ফলে যাত্রীদের অনীহা তৈরি হয়। অথচ এমনটি হওয়ার কথাই নয়। নদীর নাব্য ফেরানো যেমন জরুরি, তেমনি পরিকল্পনামাফিক নৌপরিবহন কার্যক্রম সাজাতে হবে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিন। ঢাকার নদীগুলোর নাব্য সংকট, দূষণের ফলে তীব্র দুর্গন্ধ ও ময়লা-আবর্জনার কারণে পরিবেশ প্রতিকূল। অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আরও মনে করি, গাবতলী থেকে শুরু করে আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সদরঘাট ও বসিলা হয়ে পুনরায় গাবতলী পর্যন্ত প্রায় ১১০ কিলোমিটার নৌপথ ফের চালুর পরিকল্পনানুযায়ী বাস্তবায়ন বা কার্যকরের জন্য প্রচারেও জোর দিতে হবে। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে চালাতে হবে কার্যক্রম। শুধু  যাতায়াত নয়, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ও বিনোদনের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ট্রাভেল ট্যুর কোম্পানিগুলোকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। নৌপথসেবা যাত্রীবান্ধব করা যায় ভাবতে হবে এ নিয়েও। ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই বলা হয়েছিল টঙ্গী রেলওয়ে সেতুসহ কয়েকটি নিচু ব্রিজের কারণে নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যে কোনো ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে সবার আগে অবস্থা ভালো করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, যে কোনো কাজ নিয়মশৃঙ্খলার  মধ্যে করলে তা কঠিন থাকে না।

শৃঙ্খলা, সুব্যবস্থা জীবনাচারে অন্যতম অনুষঙ্গ কিন্তু এ ক্ষেত্রে যদি কোনো প্রতিকূল-প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় তাহলে এর নিরসনে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিটি মহলকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী, রাজনৈতিক নেতা এবং প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা যথার্থই বলেছেন, ‘ভয় বা আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং আশার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং এর বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে সমন্বয়ের ওপর।’ আমরাও মনে করি, সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয় না।