উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে টানা ১১৫ দিন সাগরে আটকে ছিলেন বাংলাদেশি জাহাজের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, খাদ্য ও পানির সংকট এবং আতঙ্কগ্রস্ত নাবিকদের নিয়ে প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়েছে তাকে। দেশে ফিরে বার্তা সংস্থা এএফপিকে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি।
৫১ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম বলেন, 'আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করেছি, কারণ আমার দায়িত্বে ছিল ৩১ জন নাবিকের জীবন, প্রায় ৪ কোটি ডলার মূল্যের একটি জাহাজ এবং ৮২ লাখ ডলার মূল্যের পণ্য।'
তিনি বাংলাদেশি বাল্ক ক্যারিয়ার বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলা শুরুর প্রায় এক মাস আগে জাহাজটি উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছায়। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌচলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং ইরানের হামলার কারণে একের পর এক জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের চার্টারে পরিচালিত বাংলার জয়যাত্রা প্রায় চার মাস উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে ছিল।
শফিকুল ইসলাম জানান, কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায় জাহাজটি। তখনই তিনি পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা টের পান।
তিনি বলেন, '২৮ ফেব্রুয়ারির ভোরে আমাদের জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি তেলের সংরক্ষণাগারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। মুহূর্তেই সেখানে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।'
নাবিকরা উৎকণ্ঠার মধ্যে টাগবোটগুলোকে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে দেখেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জাহাজ ত্যাগের পরামর্শ দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—এই আশায় জাহাজেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শফিকুল ইসলাম।
কিন্তু এরপরও একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলতে থাকে। বিস্ফোরণের শব্দে প্রকম্পিত হতে থাকে চারপাশ, এমনকি জাহাজের নেভিগেশন ব্যবস্থাও বিকল হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বহু বছর পর আবারও বাতিঘরের অবস্থান দেখে হাতে-কলমে জাহাজ পরিচালনা করতে হয় বলে জানান তিনি।
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে জাহাজটি পণ্য খালাস করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পূর্ব দিকে যাত্রার নির্দেশ পায়। কিন্তু ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দেয়নি। হরমুজ থেকে মাত্র ২৫ নটিক্যাল মাইল দূর থেকেই জাহাজটিকে বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ কমে আসে এবং খাদ্যসংকট দেখা দেয়। তখন সীমিত আকারে খাবার ও পানি বণ্টনের ব্যবস্থা করেন ক্যাপ্টেন।
তিনি জানান, ক্রুদের মধ্যে অনেকেই প্রথমবারের মতো সমুদ্রে এসেছিলেন এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। 'আমি তাদের সাহস দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কেউ সারাদিন কোরআন তেলাওয়াত করত, কেউ টিকটক দেখে সময় কাটাত। আমার একটাই লক্ষ্য ছিল—সবাই যেন শান্ত থাকে।'
এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ২৩ জুন জাহাজটি প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি পায়। বিপজ্জনক জলসীমা পেরোনোর পরই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন নাবিকরা।
শফিকুল ইসলাম বলেন, 'আমরা তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'ক্যাপ্টেন হিসেবে আমাকে শুধু নাবিকদেরই নয়, দেশে থাকা স্ত্রী-সন্তানকেও আশ্বস্ত রাখতে হয়েছে। তারা বহু রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে।'
প্রতিবার বাড়ি ফিরলে পরিবার তাকে সমুদ্রের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। তবে শফিকুল ইসলামের সিদ্ধান্ত, তিনি আরও কয়েক বছর সমুদ্রেই কাজ চালিয়ে যাবেন।
- ফ্রান্স২৪ এর প্রতিবেদন অবলম্বনে