ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাপান। একই সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছে সরকার। সূত্র জাপান টাইমস।
মঙ্গলবার (৪ জুলাই) মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া ৫৯৮ পৃষ্ঠার বার্ষিক প্রতিরক্ষা প্রস্তাব বলা হয়েছে, যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে জাপানকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এতে আবারও বলা হয়েছে, চীনই জাপানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও তৎপরতা টোকিওর উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে, সামরিক সক্ষমতা জোরদার করেছে এবং চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার জবাবে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার আরও প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পক্ষে জনসমর্থন আদায়ে এবারের শ্বেতপত্রকে সাধারণ পাঠকের জন্য আরও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এ কারণে জাপান উপকূলীয় প্রতিরক্ষার জন্য নিজস্ব যুদ্ধ ড্রোন উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, যা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বলেছেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত অগ্রগতি।
জাপানের অধিগ্রহণ, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংস্থা ৩৮টি আবেদন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বেছে নিয়েছে। আগস্টে নৌবাহিনীর পরীক্ষার পর চূড়ান্ত নির্বাচন হবে। এদিকে তোশিবা জানিয়েছে, তারা স্টার্টআপ প্রো ড্রোন-এর সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ ড্রোন তৈরি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় সামরিক বাহিনীতে সদস্যসংকট মোকাবিলায় চালকবিহীন অস্ত্র ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চীনা পণ্যের আধিপত্যের কারণে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক যুদ্ধ ড্রোন তৈরি করা জাপানের জন্য সহজ হবে না।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় জাপান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপগুলোতে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। একই সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরে চীনা যুদ্ধজাহাজের বাড়তি তৎপরতা মোকাবিলায় বিশেষ গবেষণা ইউনিট গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, চীন পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছাড়াই সামরিক ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং দ্রুত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে।
এ ছাড়া চীন ও রাশিয়ার যৌথ সামরিক তৎপরতা এবং উত্তর কোরিয়ার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতাও উদ্বেগের কারণ বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প ও অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার স্টার্টআপ ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় প্রতিরক্ষা শিল্পের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোইজুমি বলেন, যৌথ অস্ত্র উন্নয়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তর জাপানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাও বাড়াবে।
এরই মধ্যে জাপান অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে উন্নত মোগামি-শ্রেণির ১১টি ফ্রিগেট যৌথ উন্নয়ন ও সরবরাহের চুক্তি করেছে। একই ধরনের চুক্তি নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং ফিলিপাইনের কাছে অবসরপ্রাপ্ত ডেস্ট্রয়ার বিক্রির বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।