চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় আমি পড়াশোনা করতাম না। আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখন আমি জব করতাম। চিত্রনায়ক রাজ্জাকের মার্কেট রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সে। তবে পড়াশোনা আবার শুরু করার ইচ্ছা আছে। এখন যেহেতু ইচ্ছা আছে রাজনীতি করার আর রাজনীতির জন্য পড়াশোনা করার দরকার আছে। সে জন্য পড়াশোনা আবার শুরু করব।
আমি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি ১৪ জুলাই। সেদিন দুই ঘণ্টার মতো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। এরপর মার্কেট খোলা থাকায় থাকতে পারিনি। পুরোপুরি যুক্ত হই ১৮ জুলাই। কারণ সেদিন থেকে মার্কেট ঘোষণা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী যখন আন্দোলনরত আমাদের ভাইবোনদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সবার বিবেক নাড়া দিয়েছিল। আমি যদি পড়াশোনা কন্টিনিউ করতাম তাহলে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে থাকতাম। তাদের পাশে থেকেই আন্দোলন করতাম। তাদের প্রতি একাত্মতা অনুভব করেই আমি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি।
১৮ জুলাই থেকেই আমি দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিলাম। ১৮ জুলাই থেকে আমি ৩৬টি রাবার বুলেটের শিকার হয়েছিলাম। এরপর ২৩ জুলাই, ২৭ জুলাই, ৩ আগস্ট। পরবর্তী সময় ৫ আগস্টে তো গুলিবিদ্ধ হই। ৫ আগস্টে খুনি হাসিনার দেশত্যাগের খবর পাওয়ার পর আমরা পুলিশ বাহিনীকে বলেছিলাম, ‘আপনারা গুলি চালায়েন না। যার নেতৃত্বে আপনারা গুলি চালিয়েছেন সে কিন্তু ইতিমধ্যে পালিয়ে গেছে।
জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই করে আপনারা কিন্তু টিকতে পারবেন না। আপনারা গোলাগুলি থামিয়ে দিন। আমরা আপনাদের সঙ্গে লড়াই করব না।’ তারা কিন্তু গোলাগুলি থামায়নি। তখন আমরা ভাবলাম, তারা যদি গুলি না থামায় তাহলে আমরা কেন লড়াই থামাব? আমরাও আমাদের অবস্থান থেকে লড়াই চালিয়ে যাই।
তারপর বিকাল চারটার দিকে আমি গুলিবিদ্ধ হই। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসার জন্য ঘোরাঘুরি করার পরও সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় পরদিন ৬ আগস্ট রাত ১২টার পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ডান হাতটি কেটে ফেলতে হয়।
জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে স্মরণীয় হৃদয়বিদারক ঘটনাটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি ৫ আগস্ট। বেলা ১১টার দিকে আমি যখন একটি পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলাম তখন একটি ছেলে আমর সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তখন আমি তাকে বলেছিলাম, ‘ভাইয়া, সামনে তো কোনো সেফটি নেই। গুলি লেগে যেতে পারে।’ উনি তখন বলেন, ‘না, কিছু হবে না।’ এটা বলে সে সামনে যায় এবং তখনই একটি গুলি এসে তার মাথায় লাগে। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার মাথার ঘিলু বের হয়ে যায় এবং মাটিতে শুয়ে কাতরাতে থাকে।
এভাবে দুই মিনিটের মতো কাতরানোর পরে আমরা দেখি যে, সে আর কাতরাচ্ছে না। আমার সামনে ঘটনাটি ঘটলেও আমি কিছুই করতে পারছিলাম না। কারণ সামনে কোনো সেফটি ছিল না। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ভীষণ গুলি চালাচ্ছিল। তারপর তারা যখন রাজলক্ষ্মীর দিকে গুলি চালাচ্ছিল আর আমরা রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের দিকে ছিলাম, তখন দেখলাম যে, এদিকে গুলি কম হচ্ছে, তখন তাকে আনতে যাই। তার অবস্থা দেখে অনেকেই বলে, সে বাঁচবে না। মারা গিয়েছে। তখন আমরা বলি, আমরা মেডিকেলে পাঠাই। ডাক্তার দেখার পরে ডাক্তারই বলতে পারবে যে, সে বাঁচবে কিনা বা এখনো বেঁচে আছে কিনা। এগুলোই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার। আমরা একাত্তরের গল্প শুনেছি। একাত্তরের পরে চব্বিশের জুলাই-ই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ সময়।
আমরা শুধু এগুলো দেখেছি বা শুনেছি তা না, আমরা রাজপথেও লড়াই করেছি। আর রাজপথের এই সিচুয়েশনগুলো আমাদের কাছে আজীবনের জন্য ইতিহাস হয়ে থাকবে। আরেকটা ছেলে ছিল। সেও মাথায় গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে। সে একটু হেলদি ছিল। আমি একা তাকে সহযোগিতা করতে পারিনি। পরে তাকে আমরা কুয়েত মৈত্রী মেডিকেলে পাঠাই। সে আমাদের হাতেই ছটফট করতে করতে মারা যায়। আমরা নিজেদের কোলে নিজেদের ভাইকে ছটফট করে মরতে দেখেছি। এগুলো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে থাকার বিষয়।
আমি জানি না সরকার আমাদের কতটুকু পুনর্বাসন করবে। এককালীন ক্ষতিপূরণ ৩ লাখ টাকা পেয়েছি। অনেকে সুস্থ স্বাভাবিক থাকার পরও এ ক্যাটাগরিতে সহযোগিতা পেয়েছে। অথচ আমি একটি হাত হারিয়েও বি ক্যাটাগরিতে আছি। এ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আবেদন করেছি কয়েকবার, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। আমার লড়াই সংগ্রাম মিডিয়া বেশ ভালোই হাইলাইট করেছে। আমার ক্ষেত্রেই যেহেতু এমন হচ্ছে আমার মনে হয় না কোনো ভাই সরকারের কাছ থেকে খুবই বেশি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে যাচ্ছে। আগামীতে করলে জানা যাবে।
প্রথমে আন্দোলনে যোগ দিই প্রতিবাদ করার জন্য। পরে যখন দেখি ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতাকে ভালোবাসে এবং ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য গুলি চালাতেও দ্বিধা করছে না তখন সিদ্ধান্ত নিই যেকোনো মূল্যে সরকারের পতন ঘটাতে হবে। তখন তো স্বপ্ন ছিল নতুন একটা বাংলাদেশের। যেখানে কোনো গুম-খুন থাকবে না। যেখানে গভীর রাতেও মানুষ বুক ফুলিয়ে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। যে বাংলাদেশে স্বাধীনতা থাকবে। দুঃখের বিষয়, আমরা সেই বাংলাদেশ এখনো পাইনি। তাহলে সেই বাংলাদেশ পেলাম কোথায়?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হয়ে গেল। আমরা তো সেই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ পাইনি। সেক্ষেত্রে আমার চাওয়া থাকবে, দেশটা এমন অবস্থানে পৌঁছে যাক যেখানে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন দেখা যাবে। যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছিল তারা যেই স্বপ্ন নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিল সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হোক। আমরা তো চাই গুম-খুন না থাকুক। আমরা তো চাই রাজপথে চলাচলের স্বাধীনতা থাকুক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকুক।